
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। মহান মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা। রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে প্রাণ বাঁচিয়েছেন অসংখ্য আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার। জাতির যেসব সূর্যসন্তান আজকের এই স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন তাদের অন্যতম তিনি।
স্বাধীন দেশে তিনি হতে পারতেন দেশসেরা সার্জন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন চিকিৎসাখাতের প্রধান ব্যবসায়ী। কিন্তু ভিন্নধাতুতে গড়া এক লড়াকু মানুষ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। স্বাধীন দেশে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন গণমানুষের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের করেছেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মী। প্রথম উদ্যোগ নিয়েছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের। জনকল্যাণধর্মী চিকিৎসানীতির মাধ্যমে দেশে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি প্রণয়ন, জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে অগ্রসর শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও নারী উন্নয়নে রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। সরকার ও রাষ্ট্রের, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছেন বুকচিতিয়ে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, অনিশ্চিত তখনই বিবদমান পক্ষের মাঝখানে সমঝোতার সেতুর ভূমিকা নিয়েছেন।
রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকে একজন ব্যক্তিমানুষের পক্ষে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য যতটুকু কাজ করা সম্ভব তার সর্বোচ্চটাই করেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি অবস্থান নিয়েছেন কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনে। সবমিলিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্যক্তিত্বের শিখরস্পর্শী এক উচ্চতায়। মহান এ ব্যক্তিত্বকে আজ অপমান, মানহানি আর অব্যাহতভাবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হচ্ছে মামলা।
দেশের মানুষকে কম পয়সায় চিকিৎসা দিতে তিলতিল করে যে হাসপাতালটি তিনি গড়ে তুলেছেন সেটির ওপর দুর্বৃত্তদের হাত পড়ছে। ছাত্রজীবনে চড়তেন দামি গাড়িতে। ছিল পাইলটের লাইসেন্স। লন্ডনে পড়াশোনা অবস্থায় রাজকীয় দর্জি তার বাসায় এসে মাপ নিয়ে স্যুট তৈরি করতেন বলে অতিরিক্ত পরিশোধ করতেন ২০ পাউন্ড। বাস্তবজীবনে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এ মহান চিকিৎসক বর্তমানে যাপন করেন সাধারণ জীবন। দেশে-বিদেশে কোথাও তার একটি ফ্ল্যাট পর্যন্ত নেই। বোনকে দান করে দিয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিজমা। মরণোত্তর দেহদান করায় দাফনের জন্যও প্রয়োজন হবে না জমির। অথচ তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলা হয়েছে ভূমি দখলের।

১৯৪১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ও পৈত্রিক নিবাস। বড় হয়েছেন ঢাকায়। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পিতামাতার দশজন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা মেডিকেলে। ছাত্র ইউনিয়নের মেডিকেল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে করেছিলেন সংবাদ সম্মেলন। ১৯৬৪ সালে ডিএমসি থেকে এমবিবিএস ও ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। বৃটেনে প্রথম বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিডিএমএ)’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বাংলাদেশে ফেরার গল্পটি সিনেমার কাহিনীকে হার মানায়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইড পার্কে যে কয়েকজন বাঙালি পাসপোর্ট ছিঁড়ে আগুন ধরে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন তাদের একজন ডা. চৌধুরী। তারপর বৃটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে ‘রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকের’ প্রত্যয়নপত্র নিয়ে সংগ্রহ করেন ভারতীয় ভিসা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার কালজয়ী সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’র ১৬১-১৬২ পৃষ্ঠায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়ে লিখেছেন- ‘চেনা হয়ে উঠেছে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. এমএ মোবিন। এরা দুজনে ইংল্যান্ডে এফআরসিএস পড়ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন এফআরসিএস পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিলো, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করলো, ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট যোগাড় করে দিল্লিগামী প্লেনে চড়ে বসলো। উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। প্লেনটা ছিল সিরিয়ান এয়ারলাইন্স-এর। দামাস্কাসে পাঁচ ঘণ্টা প্লেন লেট, সবযাত্রী নেমেছে। ওরা দুইজন আর প্লেন থেকে নামে না। ভাগ্যিস নামেনি। এয়ারপোর্টে এক পাকিস্তানি কর্নেল উপস্থিত ছিল ওই দুইজন ‘পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে’ গ্রেপ্তার করার জন্য।

প্লেনের মধ্য থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না, কারণ প্লেন হলো ইন্টারন্যাশনাল জোন। দামাস্কাসে সিরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্মকর্তা ওদের দুইজনকে জানিয়েছিল- ওদের জন্যই প্লেন পাঁচ ঘণ্টা লেট। এমনিভাবে ওরা বিপদের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষাশেষি সেক্টর টু রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হয়েছে।’
যুদ্ধ যখন বিস্তার লাভ করে যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহত যোদ্ধা, উদ্বাস্তু ও নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নর-নারীর জরুরি চিকিৎসাসেবায় প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় একটি হাসপাতালের। মুক্তিযুদ্ধের ২ নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ও ভারতের জিবি হাসপাতালের প্রধান সার্জন ডা. রথিন দত্তের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের প্রথম জিএস ডা. এমএ মবিনকে নিয়ে আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরে হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানে গড়ে তোলেন প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল- ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। হাসপাতালটির কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন ডা. সিতারা বেগম বীরপ্রতীক। সেসময় প্রশিক্ষিত নার্স না থাকায় নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সে হাসপাতালের দুই স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও তার বোন সাঈদা কামাল। মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতাল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে বহনকারী যে হেলিকপ্টারটি হামলার শিকার হয়েছিল তাতে অন্যদের মধ্যে ছিলেন- ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গ্রামে ফিরে গিয়ে স্বাস্থ্যযুদ্ধ শুরু করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালটি গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র নামে গড়ে তুলেন কুমিল্লায়। পরে সেটা স্থানান্তর করেন ঢাকার অদূরে সাভারে। এ ‘গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র’ নামটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন প্রায় ৩১ একর জমি সরকারিভাবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পাইলট প্রজেক্ট গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাইমারি কেয়ার কনসেপ্ট মাঠে প্রমাণ করে এবং এর ভিত্তিতে হু আর ইউএনও আলমাআতা কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্লোবাল ইউনিভার্সাল প্রাইমারি কেয়ার প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। গ্লোবাল প্যারামেডিক যে কনসেপ্ট ও ট্রেইন্ড প্যারামেডিক দিয়ে মিনি ল্যাপারোটমির মাধ্যমে লাইগেশন সার্জারির উদ্ভাবক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এ সংক্রান্ত তার পেপারটি বিশ্ববিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট মূল আর্টিকেল হিসেবে ছাপা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল পেডিয়াটিক্স টেক্সট বইয়ের একটা চ্যাপ্টার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী লিখতেন অনেক বছর ধরে। দেশে-বিদেশে তার লেখা বই ও পেপারের সংখ্যা প্রচুর। প্রাইমারি কেয়ার নিয়ে লেখা তার সম্পাদিত ও প্রকাশিত একটি বই ‘যেখানে ডাক্তার নেই’-একসময় অবশ্য পাঠ্য ছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের লক্ষ্যে প্রথম বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান ছিলেন তিনি। ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ছিল এদেশের মধ্যবিত্তের মৌলিক একটি প্রকাশনা। সর্বোচ্চ প্রচারণা ছিল বিচিত্রার প্রধান হাতিয়ার। সত্তর দশকের বিচিত্রায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী প্রমুখ ছাড়া হাতেগোনা যে ক’জন বিচিত্রার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিলেন- ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাদের একজন। সোনালী ধানক্ষেতের ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন ঝাঁকড়া চুলের তরুণ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এমন একটি ছবি প্রচ্ছদ করেছিল বিচিত্রা। ১৯৭৯ সাল থেকেই তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশে শিক্ষা ও নারীনীতি প্রণয়নে। তবে গণস্বাস্থ্যের পর তার ম্যাগনাম ওপাস হচ্ছে ১৯৮২ সালের জাতীয় ঔষুধ নীতি। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যখাতে যেটাকে বিবেচনা করা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে। তার প্রচেষ্টায় আমদানি ওষুধের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২৫। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ওষুধ রপ্তানিকারক দেশে। অথচ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ১৯৯২ সালে তার সদস্যপদ বাতিল করেছিল বিএমএ। বিনা বিচারে তার ফাঁসি চেয়ে পোস্টারও সাঁটিয়েছিল। তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা-বিশ্বাস করেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা। ফিল্ড হাসপাতালের সহযোগী চিকিৎসক ও গেরিলা যোদ্ধা ডা. মোরশেদ চৌধুরী আমৃত্যু কাজ করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ফিল্ড হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত চিকিৎসক এমএ মুবিন বাংলাদেশে এলে এখনো চিকিৎসা দেন গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের সময়ে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কিন্তু অনুপ্রাণিত করেছেন বহু ভালো পদক্ষেপ গ্রহণে। তার পরামর্শে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের পক্ষে পাসপোর্ট ইস্যু করে বিলেতের এক লাখ বাঙালির কাছ থেকে আবু সাইয়িদ চৌধুরীর সংগ্রহ করেছিলেন ১০ লাখ পাউন্ড চাঁদা। বঙ্গবন্ধুকে বহুজাতিক কোম্পানির দুর্নীতির বিষয়ে অবহিত করে সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে ঔষুধ আমদানিতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বাকশালে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিলে বিএনপিতে স্বাধীনতাবিরোধী থাকায় চার পৃষ্ঠার চিঠির মাধ্যমে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে নাগরিকের পাসপোর্ট পাওয়াকে সহজলভ্য ও নিশ্চিত করেছিলেন। ১৯৮০ সালে জিয়ার গড়া প্রথম জাতীয় মহিলা উন্নয়ন কমিটির দুই পুরুষ সদস্যের একজন হিসেবে প্রাথমিকে ৫০ শতাংশ মহিলা শিক্ষক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ছাত্রী নেয়ার সুযোগ করেছিলেন, যা কার্যকর হয়েছিল এরশাদ আমলে। জিয়াউর রহমানের আমলে পুলিশে মহিলা নিয়োগ দেয়া শুরু হলে দেশের প্রথম দুই নারী পুলিশ- হিসেবে নিয়োগ পান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মী হোসনে আরা ও চামেলী বেগম। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে উপেক্ষা করেছিলেন এরশাদের প্রস্তাব। তার পরামর্শেই এরশাদ আমলে পোস্টার, বিলবোর্ড বাংলায় লেখা ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন, উপজেলাব্যবস্থা ও সফল জাতীয় ঔষুধনীতি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে রাখেন, তেমনি কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রতিও রয়েছে তার অকুণ্ঠ সম্মান। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হওয়ার পর সেদিন দুপুরে লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বৃটিশ সাংবাদিকদের বলেছিলেন- ‘তিনি নিজের রক্ত দিয়ে জাতির ঋণ পরিশোধ করে গেলেন।’
শারীরিকভাবে খুব একটা সুস্থ নন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস’র ওপর নির্ভর করে একরকম বেঁচে আছেন। কিন্তু জনগণের অধিকার আদায়ের তাড়না যার হৃদয়ে- তাকে কি আদৌ ডায়ালাইসিস দমাতে পারে? তাকেও পারেনি! শরীরের এমন নাজুক অবস্থার মধ্যেও তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন অফুরন্ত মানসিক শক্তি নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানাভাবে তৎপরতা চালিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও নানা পরামর্শ দিয়েছেন।

বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন প্রথম জীবনে। দেশে-বিদেশে রয়েছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। জাতীয় সংকটে নিজের দায়বোধ থেকে তিনি উদ্যোগী হয়েছেন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলায়। তিনি সুবিধাবাদী সুশীল নয়, একজন বিবেকবান বুদ্ধিজীবী। তিনি কোনো ‘বাঁকা চোখের’ পরোয়া করেননি। সম্প্রতি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেনাবাহিনী প্রধান সম্পর্কে একটি ভুল তথ্য উপস্থাপন করে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেটা উপলব্ধি করে তিনি পরদিনই সংবাদ সম্মেলন করে এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর চাঁদাবাজি, জমিদখল, পুকুরের মাছ চুরির অভিযোগসহ একের পর এক মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দুটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের এন্টিবায়োটিকের কাঁচামাল জব্দ ও এন্টিবায়োটিক বিভাগ সিলগালা ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে ১৫ লাখ টাকা। গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার অভিযোগে হাসপাতালকে আরো ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। অথচ সাধারণ মানুষকে কমদামে ওষুধ সরবরাহ করতে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দামি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের বদলে ট্যাবলেট তিনি প্যাকেট করার প্রচলন করেন সাধারণ কাগজে।
২০১৫ সালে বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের আদালত অবমাননার সাজায় উদ্বেগ জানিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতি দেয়ার ঘটনায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এক ঘণ্টার কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তার প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে মাত্র এক হাজার ২০০ টাকায় ডায়ালাইসিস করতে পারেন দরিদ্র মানুষ। তার প্রতিষ্ঠিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বামী প্রয়াত বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, জেন্ডার ইস্যু, নীতিবিদ্যা ও সমাজ, পরিবেশবিদ্যা, ইংরেজি এবং বাংলা অবশ্যই পড়তে হয়। দরিদ্র ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সংরক্ষিত আসন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দাপ্তরিক কাজ হয় বাংলাভাষা ও বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে। বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ সার্ভিসের এই আইকন সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পদক পান ১৯৭৭ সালে পদকটি প্রবর্তনের বছর। বিকল্প নোবেল খ্যাত র?্যামন ম্যাগসাই পান ১৯৮৫ সালে। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে সুুইডিশ ইয়ুথ পিস প্রাইজ, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেনের লাইভ লাই হুড পুরস্কার, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথ হিরোজ’ পুরস্কার লাভ করেন।

সূত্রঃ
কাফি কামাল
দৈনিক মানবজমিন
১২ নভেম্বর ২০১৮, সোমবার
জাফর স্যার-
৩০ বছর ধরে পরেন একটা শার্ট, ওপরের বোতাম তার ছেঁড়া। কেউ একজন জিজ্ঞাসা করতে বলেছিলেন, “নষ্ট না হলে আমি কি করব,ফেলে তো দিতে পারি না !”
অথচ বাবা তার রাউজানের জমিদার। লন্ডনে পড়তে গিয়ে তার যে গাড়ি ছিল, দেশ থেকে বড়ো কেউ গেলে সে গাড়িই ধার দেয়া হতো তাদের। তিনি যে দর্জির কাছে কাপড় সেলাই করতেন, সে দর্জি ছিলেন ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স চার্লসের ব্যক্তিগত দর্জি৷ দেশে ফিরে দেশের মানুষের জীবদ্দশা দেখে সেই বিলাসী জীবন ত্যাগের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জাফরুল্লাহ, আ*মৃ*ত্যু তাই পালন করেছেন।
লন্ডনের প্রকাশ্য রাস্তায় নিজেদের পাসপোর্টে আগুন ধরিয়ে দিলো কয়েকজন বন্ধু। এরা সবাই এবারের এফআরসিএস পরীক্ষার্থী৷ পরীক্ষা আর দেয়া হলো না, রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে লন্ডন থেকে ফেরত পাঠানো হলো ভারতে৷ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে পাকিস্তানের পাসপোর্ট পোড়ানো সে বন্ধুদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
ভারতে এসে আগরতলা ক্যাম্পের একপাশে চট-বেড়া দিয়ে গড়ে তুললেন ৪৮০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল। দিনরাত এক করে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ চলল তাতে। যুদ্ধ শেষ হলে এ হাসপাতালই হয়ে উঠল গরিবের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র৷ আজ ৫০ বছর পরেও, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নর্মাল ডেলিভারি বা ডায়ালাইসিস খরচ ২৫০০ টাকা৷ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ভদ্রলোকের জন্য ভিআইপি কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, আনা হচ্ছিল দামী ওষুধ৷ দুটোকেই ‘না’ করে জাফরুল্লাহ বললেন, ‘ নিজের হাসপাতালের ওপর নিজে ভরসা না রাখলে মানুষ কি করে রাখবে? যে ওষুধ গরীবে কিনে খেতে পারবে না, সে ওষুধ আমি নেব না।’
১৯৮২ সালে জাতীয় ওষুধ নীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন জাফরুল্লাহ। স্বপ্নবাজ এ লোকটির হাত ধরেই ৯০ শতাংশ ওষুধ আজ দেশেই তৈরি হয়। বিনামূল্যে বিলি হয় গণস্বাস্থ্যের ওষুধ। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রই আবিষ্কার করেছিল বাংলাদেশের করোনা টিকা বঙ্গভ্যাক্স, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছিল যে টিকা, পায়নি কেবল বাংলাদেশে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাকরির কয়েকটা বাঁধাধরা নিয়ম তিনি করেছিলেন। কর্মরতদের ধূমপান নিষিদ্ধ । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিঞার চাকরির ব্যাপারে ১৯৯৬ সালে নেত্রী নিজেই ফোন করেন জাফরুল্লাহকে। তিনি শেখ হাসিনাকে তখনই সাফ জানিয়েছিলেন, ‘ ধূমপান ছাড়তে না পারলে চাকরি হবে না। ‘ বাধ্য হয়ে একমাসেই ধূমপান ছাড়েন ডা. ওয়াজেদ।
দোর্দণ্ড প্রতাপে যখন ক্ষমতায় এসেছেন জিয়াউর রহমান, জাফরুল্লাহকে মেজর জিয়া হাতে একটা ফাঁকা চেক ধরিয়ে আদেশ দিলেন, মন্ত্রী হও৷ সেদিন গরিবের ডাক্তার ৪ পৃষ্ঠার চিঠি লিখে জবাব দিয়েছিলেন, একজনও স্বাধীনতাবিরোধী থাকলে সে মন্ত্রীসভায় তিনি যাবেন না৷
৮-১৮’র তরুণরা যখন নির্লিপ্ত, তখন ৮০ বছর বয়সেও হুইল চেয়ারে রাজপথ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এই মানুষটি৷ দাঁড়িয়েছেন বিচারের কাঠগড়ায়,পেয়েছেন অর্থদন্ডও।
নিজ প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্যের সম্পদ আছে কয়েক হাজার কোটি টাকার।পেয়েছেন ম্যাগসেসে পদকের মতো অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা। অথচ সমস্ত জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করে কপর্দকহীন হয়ে চলে গেলেন একগুঁয়ে মানুষটি। একেকটা হাসপাতাল যখন হয়ে উঠছে মানুষ মারার কল, তখন গরিব যাতে কম খরচে ক্যানসার চিকিৎসা পায়, ওষুধ পায়, তার বন্দোবস্ত করে গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল গড়েছেন মানুষটি।
জীবন-ম*র*ণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষবার জাফরুল্লাহ বলেছিলেন, কিছু হলে দেশেই হোক, বিদেশে চিকিৎসা তিনি কিছুতেই নেবেন না।
সারাজীবনের মতো একবারই এই মৃ*ত্যু সাজ, এতদিন প্রাণ ছিলো, অ*ম*র*ত্ব শুরু হলো আজ . . .
এই জেদ, এই উদ্যম, এই দেশপ্রেমকে কুর্নিশ। আপনি জিতে গেছেন ১৬ কোটি হৃদয়৷ অভিবাদন, মহামানব জাফরুল্লাহ চৌধুরী!

এক নজরে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
★ চট্টগ্রামের ছেলে জাফরুল্লাহর বাবার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন।
★ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করার পর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ছাত্র থাকা অবস্থাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে করেছিলেন সংবাদ সম্মেলন।
★ ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এম. বি. বি. এস শেষ করার পর ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব সার্জনস থেকে FRCS প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না হতেই দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন।
★পাকিস্থানি বাহিনীর নির্মমতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইডপার্কে যে কয়জন বাঙ্গালী পাসপোর্ট ছিড়ে আগুন ধরিয়ে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিল তাদের একজন ড. জাফরুল্লাহ।
★মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তার জন্য বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাছ থেকে ১০ লাখ পাউন্ড চাঁদা যোগাড় করেছিলেন। তিনি কাজটি করেছিলেন ড. জাফরুল্লাহর পরামর্শে।
★ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ” একাত্তরের দিনগুলি” বইয়ের ১৬১ ও ১৬২ পৃষ্ঠায় ড. জাফরুল্লাহ ও ডা. মোবিনের পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে লিখেন।
★আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য ড. জাফরুল্লাহ ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সহযোগিতায় আগরতলার বিশ্রামঘরের মেলাঘরে গড়ে তুলেছিলেন ৪৮০ শয্যা বিশিষ্ট প্রথম ফিল্ড হসপিটাল ” বাংলাদেশ হসপিটাল”
★হসপিটালটিতে পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় ড. জাফরুল্লাহ নিজে নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেন।
★দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ড. জাফরুল্লাহ গ্রামে গিয়ে শুরু করেন স্বাস্থ্যযুদ্ধ। ফিল্ড হাসপাতালটিকেই কুমিল্লাতে স্বাধীন দেশের প্রথম হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলেন। পরবর্তীতে ঢাকার ইস্কাটনে হাসপাতালটি পুনঃস্থাপিত হয়। কিন্তু গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু রুপে গড়ে তোলার জন্যে ” চলো গ্রামে যাই” স্লোগান নিয়ে হাসপাতালটিকে ঢাকার অদূরে সাভারে ” গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র” নামে স্থানান্তর করা হয়।
★ হাসপাতালটিকে ” গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র” নামে নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাভারে হাসপাতালটির জন্য ৩১ একর জমিও বরাদ্দ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
★ সম্পূর্ণ অলাভজনক এই এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ড. জাফরুল্লাহ ১৯৭৭ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখায় স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
★ড. জাফরুল্লাহ বাকশালে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ যেমন উপেক্ষা করেছিলেন, তেমনি জিয়াউর রহমানের দেয়া মন্ত্রীত্বের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ৪ পৃষ্ঠার একটি চিঠির মাধ্যমে। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এরশাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও!
★ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পর তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ১৯৮২ সালের জাতীয় ঔষুধ নীতি। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যখাতে যেটাকে বিবেচনা করা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে। তাঁর প্রচেষ্টায় আমদানি ওষুধের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২৫-এ। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ একটি ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে এই মানুষটির অবদান বিশাল।
★ড. জাফরুল্লাহ স্বাস্থ্যনীতির সাথে জড়িত থাকায় বি. এম. এর স্বার্থে আঘাত লাগে। তাই বি. এম. এ ১৯৯২ সালে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে। বিনা বিচারে ড. জাফরুল্লাহর ফাঁসি চেয়ে পোস্টারও সাঁটায় তারা।
আমরা ড. জাফরউল্লাহকে না চিনলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় ঠিকই চিনেছে এই লোকটাকে। বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় “ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো” ঘোষণা করে ড. জাফরুল্লাহকে।
মুক্তিযুদ্ধ করেও, গণমানুষের জন্য কাজ করেও ড. জাফরুল্লাহরা হন বিতর্কিত। কারন, উনারা চাটুকারিতা করতে জানেন না, দালালী করতে জানেন না, জানেন না তেল দিতে!
নষ্ট রাজনীতির বিভাজনে থাকা তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুরোধ, এই মানুষটাকে যদি সম্মানিত করতে নাও পারি, অন্ততপক্ষে যেন ছোট না করি।

এই বোকাসোকা মানুষটা জীবনের সব যুদ্ধে জিতে এসে অবশেষে হার মানলেন মৃত্যুুর কাছে। জীবনের একেবারে অন্তিম সময়ে পর্যন্ত উনাকে বলা হয়েছিলো চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিয়ে যেতে, কিন্তু উনি রাজি হননি। অভাগা এই দেশেই চিকিৎসা নেওয়ার ব্রত তিনি নিয়েছিলেন, ঠিক ওই মুহূর্তেও সেটা ভুলে যেতে চাননি উনি।
এত বোকাও একজন মানুষ হতে পারে?
নক্ষত্রেরও পতন হয়, মহাকালের গহ্বরে হারিয়ে যায় সব রথীমহারথীরাও। সেই অমোঘ যাত্রায় এবার সামিল হয়ে গেলেন এই বোকা মানুষটাও।
এই বোকাসোকা মানুষটা কে ছিলেন জানেন?
চট্টগ্রামের ছেলে জাফরুলাহ ইন্টারমিডিয়েট শেষে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকেই ওই যে শুরু হল মানবসেবার, সেটা চালু ছিল একেবারে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করার পর পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না হতেই দেশে শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধ। ডিগ্রির চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে দেশে ফিরে আসলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্থানি বাহিনী যে নির্মমতা চালিয়েছিলো, সেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল লন্ডনে। এর প্রতিবাদে লন্ডনের হাইডপার্কে যে কয়জন বাঙ্গালী তাদের পাকিস্তানের পাসপোর্ট ছিড়ে আগুন ধরিয়ে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিল,তাদের ভেতর একজন ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ। এরপর নানা কৌশলে শেষমেশ ফিরে আসলেন দেশে। লক্ষ্য একটাই— মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ।
আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য ডা. জাফরুল্লাহ ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সহযোগিতায় আগরতলার এক আনারস বাগানের ভেতর গড়ে তুলেছিলেন ৪৮০ শয্যা বিশিষ্ট প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল। নাম দিয়েছিলেন—বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল।
হাসপাতাল না হয় চালু হল, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত নার্স, বিঘ্ন ঘটছে সেবাপ্রদানে। শেষমেশ ডা. জাফরুল্লাহ নিজেই নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করে নিলেন একটি নার্সের টিম।
দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু অভাগা এই দেশকে ফেলে নিজের চাকচিক্যময় জীবনে আর ফেরত যাননি ডা. জাফরুল্লাহ।
গ্রামে গিয়ে শুরু করেন স্বাস্থ্যযুদ্ধ। ফিল্ড হাসপাতালটিকেই কুমিল্লাতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুললেন। পরবর্তীতে ঢাকার ইস্কাটনে ঘুরে শেষমেশ হাসপাতালটি ঢাকার অদূরে সাভারে স্থানান্তর করা হয়।
এবার এর নাম হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।
সম্পূর্ণ অলাভজনকভাবে চলতে থাকে এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। নিজেকে এই হাসপাতালের পেছনে একেবারে উজাড় করে দিয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ। যা অব্যাহত ছিলো একেবারে মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত।
মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অফিসিয়াল খাতায় নিজের নাম তোলার কোন চেষ্টাই তিনি করেন নি কোনদিন। বহুবছর তার নামই ছিলোনা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধাদি পাওয়ার গ্রহীতার তালিকায়। পরে অন্যদের চেষ্টায় তার নাম উঠানো হয় তালিকায়। সেখানকার ভাতাও ব্যয় করতেন তার নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে তার নিজের ডায়ালাইসিসের খরচ বাবদ।
ডা. জাফরুল্লাহ বাকশালে যোগ দিতে শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধ যেমন উপেক্ষা করেছিলেন, তেমনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমানের দেয়া মন্ত্রীত্বের প্রস্তাবও। এরশাদের আমলে মন্ত্রীত্বের অফারও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষমতার মসনদে বসাটা তার পছন্দনীয় ছিলোনা, তার জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিলো কীভাবে মানুষের সেবা করা যায়।
১৯৭৯ সাল থেকেই তিনি রাষ্ট্রীয় কমিটির একজন সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির। গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন বাংলাদেশে শিক্ষা ও নারী-নীতি প্রণয়নে।
তার আরেকটা বড় অবদান হল ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যখাতে যেটাকে বিবেচনা করা দেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে। তাঁর প্রচেষ্টায় আমদানি ওষুধের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ একটি ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে এই মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি।
দেশ বিদেশের নানা পদক-সম্মাননা জুটেছে তার, কিন্তু কোনদিনই সেই সম্মাননার ঝলকে আলোকিত হয়ে থাকতে চাননি তিনি। বিলেতের গ্ল্যামারাস লাইফ ফেলে এসে এখানে আমৃত্যু কাটিয়ে দিলেন আটপৌরে জীবনের অতি সাধারণ জামাকাপড় পরে, তার শার্টে কখনও থাকতো না আইরন; ছেঁড়াফাঁটা, জোড়াতালি দেওয়া প্যান্টশার্টেই দিব্যি চলে যেতো তার। বিলেতে থাকতে ব্যক্তিগত গাড়ি তো বটেই, ছিল পাইলট এরও লাইসেন্স। তার স্যুট বানাতেন সবচেয়ে দামি টেইলার্স থেকে, যেখান থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের লোকজনও স্যুট বানাতো। অথচ সেই মানুষটাই মারা যাওয়ার বছর দুই আগে দেওয়া একটা ইন্টারভিউতে দেখিয়েছিলেন তার পরনের ওই শার্টটি ছিলো দীর্ঘ ৩০ বছরের পুরোনো। তাতেও দিব্যি চলে গেছে তার! দেশে-বিদেশে কোথাও তার একটি ফ্ল্যাট পর্যন্ত নেই। বোনকে দান করে দিয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সব জমিজমা।
নিজের সহায় সম্পদ বলতে কিছুই ছিলোনা তার।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সমস্যার জর্জরিত ছিলেন তিনি। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে চলতে হতো তাকে। শরীরের হাজারটা ধকল নিয়েও জাতির যেকোন ক্রান্তিকালে সাড়া দিয়েছেন একজন টগবগে তরুণের মতোই। দেশের সুশীল সমাজের সবাই যখন চাটুকারিতার তেলতেেলে বয়ান কিংবা একদম মুখে তালা এঁটে নিরাপদ জীবন বেছে নিয়েছে, তখনও একজন জাফরুল্লাহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বানে, নির্যাতিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভগ্নদশা শরীর নিয়ে নেমে গেছেন রাজপথে।
কোথাও কেউ নির্যাতনের শিকার হলে, হামলা-মামলা, জেল জুলুমের শিকার হলে হুইল চেয়ারে করেই ছুটে গেছেন তাদের পক্ষে কথা বলতে। মৃত্যুশয্যা থেকে উঠে চলে গেছেন নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে। মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অত্যাচারের শিকার কেউ হলে, সেই প্রতিবাদসভায় আর কেউ থাকুক চাই না থাকুক, এই মৃত্যুপথযাত্রী অসুস্থ বোকাসোকা লোকটা ঠিকই হাজির হতেন রাজপথের প্রতিবাদ সভায়।
সারাটা জীবন শুধু দিয়েই গেলেন অভাগা এই দেশটাকে।
বিনিময়ে দেশ থেকে পেলেন কী, জানেন? যিনি নিজের ঝকমকে ক্যারিয়ার ফেলে রেখে দেশের টানে ছুটে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে, যে তার সারাটা জীবন উজাড় করে দিলো দেশের জন্য, যার নিজের নামে কোনদিন এক ছটাক জায়গা-জমি, গাড়ি-বাড়ি করার চেষ্টাটা পর্যন্ত করেননি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য মরণোত্তর দেহ প্রদানের ঘোষণা দেওয়ায় যার কবরের জন্যও লাগবেনা এক ছটাক পরিমাণ জমি, সেই ডা. জাফরুল্লাহকে দেওয়া হয়েছিল জমি দখলের, ফল চুরির, পুকুরের মাছ চুরির মামলা।
তার কী দোষ ছিলো জানেন? ২০১৮ সালে যোগ দিয়েছিলেন সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোট ঐক্যফ্রন্টে। ব্যস!
তাতেই তার নামে জুটে গেলো পুকুরের মাছ চুরির মামলা। যাদের অবদান ছাড়া এইদেশের মাটি হতো না স্বাধীন, যার সারাটা জীবন উৎসর্গ করে গেলো এই দেশের মাটি ও মানুষের সেবায়, সেই মানুষটাকে ফাঁসানো হয়েছে জমি দখল আর পুকুরের মাছ চুরির মামলায়!
ছিঃ, এই লজ্জা কোথায় রাখি!
কত বড় বোকা তিনি। কতকিছুই তো করে ফেলতে পারতেন।
রাস্তাঘাটের চ্যালাপ্যালারা পর্যন্ত তোষামোদি আর শোষণ করে কতকিছু কামায়ে ফেললো, কত পদ পদবী জুটায়ে ফেললো, কত হোমরাচোমরা হয়ে গেলো, অথচ একজন জাফরুল্লাহ-র দিকে তাকান। সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন ছেঁড়াফাঁড়া কাপড়চোপড়ে, সবাইকে দিয়ে গেলেন নিজের সবটুকু উজাড় করে, কিন্তু নিজের জন্য কী করলেন তিনি সারাটা জীবন ধরে? নাথিং, একেবারেই শূণ্য!
কত বোকা তিনি! এত বোকাও মানুষ হয়?
সবাই দেখি শোকে বিহ্বল হয়ে যাচ্ছে। ডা. জাফরুল্লাহ নাকি মারা গেছেন। কই? তিনি মারা গেলেন কীভাবে?
যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীর কোন না কোন এক কোণে বাংলাদেশ নামক দেশটার অস্তিত্ব থাকবে, যতদিন পর্যন্ত একজনও
বাংলাদেশি বেঁচে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকবেন ডা. জাফরুলাহ।
সারাটা জীবন গর্ব করে বলতে পারবো আমি নিজ চোখে এমন একজন মানুষকে দেখতে পেরেছিলাম, এমন একজন মানুষের কণ্ঠস্বর নিজ কানে শুনেছিলাম।
আমার কাছে ডা. জাফরুল্লাহ মানেই বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন ডা. জাফরুল্লাহ
এর মৃত্যু হতে পারেনা, অন্তত আমাদের হৃদয়ে।


প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিলেন। ডাক্তার চৌধুরীর বিরুদ্ধে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা এনে তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। রাষ্ট্রপতি এরশাদ ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ক্রমাগত বিদেশী দূতাবাসের চাপ আসতে থাকে।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অফিসাররা বেশিরভাগই তখন সিএসপি অফিসার। এরা সবাই ষাটের দশকের তরুন। তাদের বেশিরভাগই বামপন্থী চিন্তার ধারক ও বাহক। তাদের মাঝে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এক ধরনের জনপ্রিয়তা রয়েছে। অদৃশ্য শক্তি ডাক্তার চৌধুরীকে সাইজ করার জন্য উপযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা খুঁজছিলেন। তারা খুঁজছিলেন একজন দাঁড়িওয়ালা -টুপিওয়ালা তদন্ত কর্মকর্তা।
নানামুখী চাপে তৎকালীন সংস্থাপন সচিব ৬২ ব্যাচের সিএসপি অফিসার এ জেড এম শামসুল আলম কে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন,,,,,,।
তদন্তের নির্দেশনা পেয়ে এ জেড এম শামসুল আলম সংস্থাপন সচিবের কাছে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বলেন “ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন বামপন্থী সমাজকর্মী। আর আমি একজন ডানপন্থী সরকারি কর্মকর্তা। তার মত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমার তদন্ত রিপোর্ট প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আমি তদন্ত কর্মকর্তা থেকে অব্যাহতি চাই।”
এদিকে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার তদন্ত কর্মকর্তা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকেন। নানামুখী খোঁজ শেষে তিনি সংস্থাপন সচিবের নিকট একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী উল্লেখ করেন ” এ জেড এম শামসুল আলম যদি আমার তদন্ত কর্মকর্তা হয়ে থাকেন তাহলে এই তদন্তে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এখানে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করলে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।”
তদন্ত কাজ শেষ হলো। তদন্ত কর্মকর্তা গোপনে রুমের দরজা বন্ধ করে তার তদন্ত রিপোর্ট লিখছেন। চারিদিক থেকে তদন্ত কর্মকর্তার উপর নজরদারি। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে বলাবলি হচ্ছিল এইবার ডাক্তার জাফরুল্লাহর আর রক্ষা নেই।
তদন্ত রিপোর্ট চূড়ান্ত করার এক পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে একটু দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। বঙ্গভবন থেকে তদন্ত কর্মকর্তাকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়া হলো।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রায় ঘন্টাখানেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি কে তদন্তের বিভিন্ন দিক অবহিত করলেন। এরপর রাষ্ট্রপতির হাতে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করলেন,,,,।
আশ্চর্য বিষয়! ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী শাস্তির পরিবর্তে কয়েকদিন পরে উল্টো মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য পরামর্শ দাতা (যেকোনো স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওনার পরামর্শ নিতেন) হয়ে গেলেন!
জানা গেছে তদন্ত কর্মকর্তা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছেন যে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক । তিনি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর ষড়যন্ত্রের শিকার। বহুজাতিক কোম্পানি গুলো নিন্মমানের ঔষধ বানিয়ে সীমাহীন মুনাফা করছিলেন। তারা ঔষধ তৈরি করে এদেশের মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে ঔষধের প্রাথমিক পরীক্ষা করছিলেন । এ বিষয়ে জাফরউল্লা চৌধুরী পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছিলেন। ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে শায়েস্তা করার জন্য সব ঔষধ কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে মাঠে নেমেছেন। আর তাতে বিদেশি দূতাবাস গুলোকেও কাজে লাগানো হচ্ছিল।
ডাক্তার জাফর উল্লা চৌধুরী পরপারে চলে গেছেন। এ জেড এম শামসুল আলম আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। তিনি রাজধানীর টিকাটুলি এলাকায় একটি ফ্লাটে বসবাস করছেন।
বামপন্থী এবং ডানপন্থী দুই ঘরানার দুই মহান দেশ প্রেমিকের বদান্যতায় আজ আমরা জাতীয় ঔষধনীতি পেয়েছি। আজ আমরা বিদেশে ঔষধ রপ্তানি করছি। বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানিগুলো একে একে পাততাড়ি গুটিয়ে এ দেশ থেকে চলে গেছে।
সেদিন এ জেড এম শামসুল আলম সঠিক দায়িত্ব পালন না করলে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী হয়তো থেমে যেতেন। নব্য ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ রূপী বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানিগুলো আজও আমাদের শোষণ করতো। একজন জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম না হলে আজ আমরা একটি প্যারাসিটামল ২০ টাকা দিয়ে কিনে খেতাম।
——————————————————————-
তথ্যসূত্র : এ জেড এম শামসুল আলম, সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব, সাবেক ধর্ম সচিব ও সাবেক মহাপরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন
Collected somewhere from FB
Leave A Comment