কয়লা কেলেঙ্কারি ও শ্রীলঙ্কার জ্বালানি রাজনীতি
পদত্যাগে নতুন প্রশ্ন, সামনে বড় পরীক্ষা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

শ্রীলঙ্কায় কয়লা আমদানিকে কেন্দ্র করে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে মন্ত্রীর পদত্যাগে। জ্বালানিমন্ত্রী কুমারা জয়াকোডি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েছেন, যা দেশটির বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব উদয়ঙ্গা হেমাপালা-ও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
সরকার বলছে, অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে জনআস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন।
সংকটের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন
এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শ্রীলঙ্কার প্রধান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র লাকভিজয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের কয়লা আমদানির ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সরকারি সূত্রও স্বীকার করেছে, নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে।
শ্রীলঙ্কার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ এই কয়লানির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—ফলে যেকোনো ত্রুটি সরাসরি জাতীয় জীবনে প্রভাব ফেলে।
তদন্তের নির্দেশ, সময়সীমা ছয় মাস
প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কয়লা আমদানির সমস্ত নথিপত্র পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ দাবি করেছেন, সরকার কোনো তথ্য গোপন করছে না এবং সব ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। যদিও প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন, তবুও জনমনে সংশয় কাটেনি।
সংসদে টিকে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি
উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই সংসদে জয়াকোডির বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবটি খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, গণমাধ্যমের সমালোচনা এবং জনঅসন্তোষের মুখে শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
এটি বর্তমান প্রশাসনের অধীনে কোনো উচ্চপদস্থ মন্ত্রীর প্রথম পদত্যাগ—যা সরকারের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Amar Deal

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জ্বালানি নির্ভরতা
শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। জ্বালানি খাতে দেশটি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক উৎপাদন ঘাটতি পূরণে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করতে হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অতীতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা, এমনকি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সপ্তাহে একদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করার মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কেলেঙ্কারি শ্রীলঙ্কার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্নগুলো হলো—
তদন্তে কী বেরিয়ে আসবে?
এটি কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে?
সরকারের প্রতি জনআস্থা কতটা প্রভাবিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করছে আসন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।
একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট—জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আরও তীব্র হতে পারে।