নবম পে-স্কেল ২০২৬ -এ অনলাইনেই বেতন নির্ধারণ: iBAS++-এ দিতে হবে যেসব তথ্য, কে কত পাবেন?
২০ গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব, সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা; ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকরের কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে অনলাইন বেতন নির্ধারণের বিষয়টি। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System)-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইনগত ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। ভেটিং শেষ হলে গেজেট প্রকাশ এবং পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর জন্য পৃথক এসআরও জারির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্য iBAS++-এ সঠিকভাবে হালনাগাদ থাকলে সফটওয়্যারভিত্তিক প্রক্রিয়ায় নতুন বেতন নির্ধারণ করা যাবে।
নোট: চূড়ান্ত গেজেট ও এসআরও প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এক নজরে নবম পে-স্কেলের আলোচিত বিষয়
- গ্রেড: ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব
- ২০তম গ্রেডের প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন মূল বেতন: ২০,০০০ টাকা
- ১ম গ্রেডের প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ মূল বেতন: ১,৫৬,০০০ টাকা
- প্রস্তাবিত কার্যকর তারিখ: ১ জুলাই ২০২৬
- বেতন নির্ধারণ: iBAS++-ভিত্তিক অনলাইন ব্যবস্থা
- পৃথক এসআরও: ৭টি খাতের জন্য
- প্রধান তথ্য: পদ, গ্রেড, যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য
iBAS++-এ কী তথ্য দিতে হবে?
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন সরকারি চাকরিজীবীর চাকরির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। এজন্য iBAS++-এ নিম্নোক্ত তথ্য সঠিকভাবে হালনাগাদ থাকার প্রয়োজন হবে—
১. বর্তমান পদ ও গ্রেড
কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান পদবি এবং সংশ্লিষ্ট পে-স্কেলের গ্রেডের তথ্য সঠিক থাকতে হবে।
২. চাকরিতে যোগদানের তারিখ
সরকারি চাকরিতে প্রথম যোগদানের সঠিক তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট গেজেট বা নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হবে।
৩. বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
চাকরিজীবনের নিয়মিত বার্ষিক বর্ধিত বেতন বা ইনক্রিমেন্টের তথ্য ও সময়সীমা হিসাবের আওতায় থাকবে।
৪. পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড
সাম্প্রতিক পদোন্নতি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড কিংবা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তথ্যও সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকতে হবে।
এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর নতুন পে-স্কেলের নিয়ম অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণ এবং প্রযোজ্য ভাতা হিসাব করার কথা রয়েছে।
অনলাইনে বেতন নির্ধারণ হলে কী বদলাবে?
বর্তমানে বেতন নির্ধারণ ও সংশোধনের বিভিন্ন ধাপে কাগজপত্র, অফিস আদেশ এবং হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের প্রক্রিয়া জড়িত থাকে। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে এসব কাজের একটি বড় অংশ সফটওয়্যারনির্ভর করার সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে—
হিসাবরক্ষণ অফিসে যাতায়াত কমতে পারে।
বারবার ম্যানুয়ালি পে-ফিক্সেশন কাগজ জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমবে।
গাণিতিক ভুলের ঝুঁকি কমবে।
সফটওয়্যারভিত্তিক হিসাবের মাধ্যমে বেতন নির্ধারণে মানবিক ভুল কমানোর সুযোগ থাকবে।
অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি কমবে।
সঠিক চাকরির তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় হিসাব হলে ভুল বেতন নির্ধারণ বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের সম্ভাবনা কমতে পারে।
ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে।
বেতন নির্ধারণের তথ্য iBAS++-ভিত্তিক ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা যাবে।
iBAS++-ভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যবহার সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন বিল ও EFT-সংক্রান্ত কার্যক্রমেও রয়েছে।
৭টি খাতে আলাদা এসআরও
বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের চাকরির কাঠামো আলাদা হওয়ায় প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সাতটি পৃথক খাতের জন্য আলাদা এসআরও জারির কথা বলা হয়েছে।
যেসব খাতে এসআরও হতে পারে
১. বেসামরিক প্রশাসন
সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য।
২. পুলিশ বিভাগ
বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য।
৩. বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
বিজিবির জন্য পৃথক বিধান।
৪. সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
সরকারি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য।
৫. স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান
স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য।
৬. সশস্ত্র বাহিনী
সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য।
৭. বিচার বিভাগ
বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বিধান।
২০ গ্রেডেই থাকছে বেতন কাঠামো?
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে—
| গ্রেড | প্রস্তাবিত মূল বেতন |
|---|---|
| ২০তম গ্রেড | ২০,০০০ টাকা |
| ১ম গ্রেড | ১,৫৬,০০০ টাকা |
অর্থাৎ প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সর্বনিম্ন মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
তবে গ্রেডভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বেতন ম্যাট্রিক্স ও ব্যক্তিভেদে নতুন বেতন কত হবে—তা চূড়ান্ত গেজেট ও সংশ্লিষ্ট বিধান প্রকাশের পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা
প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকর তারিখ হিসেবে ১ জুলাই ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কার্যকর হওয়ার জন্য প্রজ্ঞাপন, গেজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরও জারির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাই চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে তারিখটিকে প্রস্তাবিত কার্যকর তারিখ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বেতন-পেনশন ও EFT সুবিধার কী হবে?
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলেও iBAS++-এর আওতায় থাকা বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থাগুলো চালু রাখার কথা রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- বেতন বিল
- GPF
- সরকারি ঋণ
- আয়কর-সংক্রান্ত হিসাব
- EFT
- ব্যাংক হিসাবে সরাসরি বেতন পাঠানো
- পেনশন প্রদানের সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থা
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল এলেও সরকারি চাকরিজীবীদের ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থাপনার কাঠামো iBAS++-কেন্দ্রিক থাকার কথা।
তাহলে কার বেতন কত হবে?
এটাই এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নতুন পে-স্কেলে একজন কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু তার বর্তমান গ্রেডই নয়, বর্তমান বেতন, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, অর্জিত ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক চাকরির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ফলে একই গ্রেডে থাকা দুই কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস ভিন্ন হলে তাদের বেতন নির্ধারণের হিসাবও ভিন্ন হতে পারে।
নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রকাশের পর iBAS++-এ সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যক্তিভেদে নতুন মূল বেতন নির্ধারিত হওয়ার কথা।
নতুন পে-স্কেলে চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগে সরকারি চাকরিজীবীদের নিজেদের iBAS++-এ থাকা চাকরির তথ্য সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে—
পদবি → গ্রেড → যোগদানের তারিখ → ইনক্রিমেন্ট → পদোন্নতি → উচ্চতর গ্রেড
—এই তথ্যগুলোর কোনো ভুল থাকলে পরবর্তী বেতন নির্ধারণের হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে শুধু বেতন কাঠামোতেই পরিবর্তন আসবে না, বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তন আসতে পারে।
iBAS++-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পে-ফিক্সেশন চালু হলে কাগজপত্রের ব্যবহার, ম্যানুয়াল হিসাব এবং হিসাবরক্ষণ অফিসে যাতায়াত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার এবং ১ম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কত বেতন হবে, কোন নিয়মে ফিক্সেশন হবে এবং কখন থেকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে সরকারি গেজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরও প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।
Leave A Comment