ভাষা আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা : ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত -এর সংসদীয় প্রস্তাব ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক ভূমিকা
(২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮)

ভূমিকা

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক ঘটনাবলি প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সূচনা ঘটে আরও আগে—১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে। এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন পূর্ববঙ্গের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

এই নিবন্ধে তার প্রস্তাবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বক্তব্যের সারবস্তু, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে।

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নের উৎপত্তি

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ভাষা-প্রশ্নটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। পাকিস্তানের দুই অংশ—পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান—ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন ছিল।

জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষীরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৯৪৭-৪৮ সময়কালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৬ কোটির বেশি, যার বিপুল অংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।

তবুও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেয়।

২. ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮: গণপরিষদে প্রস্তাব

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কার্যপ্রণালী বিধিতে একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

তিনি প্রস্তাব করেন যে—
গণপরিষদের কার্যবিবরণী ও আলোচনায় ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে হবে।

তার যুক্তির মূল দিকগুলো ছিল:

  • পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা

  • গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে উপেক্ষা করা অন্যায়

  • রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ভাষাগত বৈষম্য জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করবে

এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হলেও শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি।

৩. জিন্নাহর অবস্থান ও রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক

১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় সফরকালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন:

“উর্দু, এবং শুধুমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবকে এই ঘোষণার পূর্ববর্তী সংসদীয় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়। ফলে ভাষা প্রশ্নটি কেবল সাংস্কৃতিক নয়, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়।

৪. ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তার ভূমিকা

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব সরাসরি গৃহীত না হলেও এটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করে:

১. রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিতর্কে নিয়ে আসে।
২. ছাত্রসমাজ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ভাষা-সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
৩. ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

অনেক গবেষক তাকে ভাষা আন্দোলনের “প্রথম সাংসদীয় কণ্ঠস্বর” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

৫. মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ হওয়া

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু করে।

২৯ মার্চ ১৯৭১ সালে কুমিল্লা থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয়।

তার বয়স তখন প্রায় ৮৪ বছর।

তিনি ভাষা-অধিকার থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকার—উভয় ক্ষেত্রেই নীতিগত অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।

৬. ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদানকে তিনটি স্তরে মূল্যায়ন করা যায়:

  • সাংবিধানিক সাহসিকতা: কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষার পক্ষে অবস্থান।

  • গণতান্ত্রিক যুক্তি: ভাষা প্রশ্নকে আবেগ নয়, পরিসংখ্যান ও নীতির ভিত্তিতে উপস্থাপন।

  • ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: ১৯৪৮ সালের সংসদীয় প্রস্তাব থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নে তার ভূমিকা আরও গভীরভাবে পাঠ্যপুস্তক ও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

শেষকথা

বাংলা ভাষা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপনকারী ব্যক্তির নাম এখনও অনেকের কাছে অজানা।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালের সংসদীয় প্রস্তাবকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন—তিনি ছিলেন ভাষাগত ন্যায়বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রদূত।

রেফারেন্স

১. পাকিস্তান গণপরিষদের কার্যবিবরণী, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮।
২. বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রকাশনা।
৩. ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ (যেমন: ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র সংকলন)।
৪. বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ভাষা আন্দোলন বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন।
৫. মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের দলিল।