বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের-
পুনর্মিলনী সংক্রান্ত আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে দু’টি কথা- কয়েকটি ভাবনা, বিশ্লেষণ ও কিছু প্রস্তাবনা।
আসসালা-মু-আলাইকুম।
প্রথমেই একটি কথা বলতে চাই, এই লেখাটি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কমিটি, মত বা আদর্শের বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার আন্তরিক অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ এবং এমন কিছু প্রস্তাবনার সমষ্টি, যা আমি মনে করি আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত পুনর্মিলনীকে আরও সফল, অংশগ্রহণমূলক এবং স্মরণীয় করে তুলতে পারে। এটি আমাদের সবার প্রিয় প্রতিষ্ঠান বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পুনর্মিলনীকে আরও সুন্দর, অংশগ্রহণমূলক ও স্মরণীয় করার আন্তরিক প্রয়াস মাত্র।
আমাদের এখানকার সবারই একটি পরিচয় আছে, একটি শেকড় আছে। সেই শেকড়ের নাম বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের অনেকের জীবনের প্রথম স্বপ্ন, প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম অর্জন এবং অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী। তাই পুনর্মিলনী শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি আবেগ, ঐতিহ্য, সম্পর্ক এবং প্রজন্মের মেলবন্ধনের একটি মহামিলনের নাম।

গত প্রায় এক বছর ধরে পুনর্মিলনীকে ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা, পরিকল্পনা, মতবিরোধ, তারিখ পরিবর্তন, সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনা আমরা সবাই দেখেছি। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, এই দীর্ঘ সময়ের আলোচনার পেছনে যেমন অনেক মানুষের ভালোবাসা, শ্রম ও আন্তরিকতা রয়েছে, তেমনি কিছু ভুল বোঝাবুঝি, যোগাযোগের ঘাটতি এবং অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
আমার বিশ্বাস, কেউই এই আয়োজনকে ব্যর্থ দেখতে চান না। সবাই নিজের অবস্থান থেকে বিদ্যালয়ের মঙ্গল এবং একটি সফল পুনর্মিলনীই প্রত্যাশা করেন। কিন্তু একটি বড় আয়োজন সফল হওয়ার জন্য শুধু সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনা, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, গত প্রায় এক বছরে পুনর্মিলনীকে ঘিরে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল অনুষ্ঠানকে কীভাবে আরও সুন্দর- প্রাণবন্ত- সফল করা যায়, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তারিখ, ব্যক্তি, কমিটি, মতপার্থক্য এবং নানা বিতর্ক নিয়ে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মধ্যে আগ্রহ কমে গেছে, কেউ দ্বিধান্বিত হয়েছেন, কেউ হতাশ- আশাহত হয়েছেন, কেউ দূরে সরে গেছেন, আবার কেউ নীরব থেকেছেন- অভিমানে, অভিযোগ-অনুযোগ, অনুরাগে।
তবে আমি এখনও বিশ্বাস করি, পরিস্থিতি যতই জটিল মনে হোক না কেন, আন্তরিকতা, দূরদর্শিতা এবং সম্মিলিত সদিচ্ছা থাকলে এখনও একটি ব্যতিক্রমী ও ইতিহাস সৃষ্টি করা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব।
প্রথমে ইতিবাচক দিকগুলো স্বীকার করা প্রয়োজন
আমরা অনেক সময় সমালোচনা করতে গিয়ে ভালো কাজগুলো ভুলে যাই।
যারা গত এক বছর ধরে এই আয়োজনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সময় দিয়েছেন, মিটিং করেছেন, মানুষের সাথে যোগাযোগ করেছেন, দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের অবদান অবশ্যই সম্মানের দাবিদার।
কারণ, বাস্তবতা হলো, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে বাইরে থেকে মতামত দেওয়া সহজ, কিন্তু মাঠে নেমে দায়িত্ব পালন করা কঠিন।
সুতরাং কমিটির সকল সদস্য, শিক্ষক- শিক্ষার্থী- অভিভাবক, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই উচিত।
তবে কিছু বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে
অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী যে তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেটাকেও একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না।
কারণ আমাদের বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং দেশের বাইরেও অবস্থান করছেন।
কেউ চাকরিজীবী,
কেউ ব্যবসায়ী,
কেউ শিক্ষক,
কেউ ব্যাংকার,
কেউ এনজিও কর্মী,
কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
তাদের সবার বাস্তবতার ধরণ একরকম নয়।
বিশেষ করে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ কিংবা বছরের শেষাংশ অনেক পেশাজীবীর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ততাপূর্ণ সময়।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট অফিস, মার্কেটিং সেক্টর, এনজিওসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত মানুষের জন্য এই সময় ছুটি পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে- অনেকের জন্যই তা প্রায় অসম্ভবই।
অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বা একাডেমিক ব্যস্ততাও থাকে।
ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে:
যদি এমন কোনো সময় নির্বাচন করা যায়, যখন অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে অবস্থান করে, তাহলে কি অংশগ্রহণ আরও বাড়বে না?
এই প্রশ্নকে অবহেলা না করে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঈদের সময় আয়োজনের পক্ষে যে যুক্তিগুলো রয়েছে
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় পুনর্মিলনী আয়োজন করলে কয়েকটি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
ক. সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা
ঈদের সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ নিজ এলাকায় ফিরে আসে।
চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, প্রবাসফেরতসহ প্রায় সবাই তখন পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য বাড়িতে থাকেন।
ফলে আলাদা করে ছুটি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
খ. ভ্রমণজনিত চাপ কমে যায়
অনেকেই শুধুমাত্র একটি দিনের অনুষ্ঠানের জন্য শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে অনাগ্রহী হন।
কিন্তু ঈদের সময় তারা এমনিতেই এলাকায় থাকেন।
ফলে পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
গ. পারিবারিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়
অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।
এর ফলে অনুষ্ঠান আরও প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর হয়।
তবে ঈদের সময় আয়োজনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে
ন্যায্যতার খাতিরে এ বিষয়টিও বলা প্রয়োজন।
ঈদের সময় অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান।
কেউ কেউ ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যস্ততায় থাকেন।
ফলে শতভাগ উপস্থিতি তখনও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ এমন কোনো তারিখ পৃথিবীতে নেই, যেটা সবার জন্য শতভাগ উপযোগী হবে।
সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত “সবার সুবিধা” নয়, বরং “সর্বাধিক মানুষের সর্বোচ্চ সুবিধা” নিশ্চিত করা।
পুনর্মিলনীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসলে তারিখ নয়
আমার মতে সবচেয়ে বড় সমস্যা তারিখ নয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি।
একটি অনুষ্ঠানে যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে—
তাদের মতামত মূল্যায়ণ করা হচ্ছে,
সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা রয়েছে,
সবাই সমানভাবে সম্মান পাচ্ছে,
তাহলে ছোটখাটো মতপার্থক্যও সহজে মিটে যায়।
কিন্তু যখন মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে, তখন সামান্য সিদ্ধান্তও বড় বিতর্কে রূপ নেয়।
তারিখ নিয়ে বিতর্ক: উভয় পক্ষের যুক্তি কতটা বাস্তবসম্মত?
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা যেন নিজেদের অবস্থানকে একমাত্র সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যদের বাস্তবতাকে অস্বীকার না করি।
২৭ নভেম্বর নির্ধারণের পক্ষে কিছু বাস্তবতা রয়েছে
কমিটির পক্ষ থেকে যে যুক্তিগুলো এসেছে, সেগুলোও পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।
যদিও ডিসেম্বর মাসে অনেক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিও কর্মীদের বছরের ক্লোজিংয়ের চাপ থাকে।
আগামী বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন জাতীয় কার্যক্রম থাকতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে তারিখ নির্ধারণ না হওয়ায় আয়োজন আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মানুষের সুবিধামতো একটি তারিখ কখনোই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এসব বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে।
কিন্তু ২৭ নভেম্বরের বিপক্ষেও শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে
অন্যদিকে যারা তারিখ পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, তাদের কথাগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কারণ,
দেশের বিভিন্ন জেলা, বিভাগ কিংবা বিদেশে অবস্থানকারী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য একদিনের ছুটিতে আসা অত্যন্ত কঠিন।
অনেক চাকরিজীবী বিশেষ করে ব্যাংক, মার্কেটিং, কর্পোরেট, এনজিও এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের মাসের শেষ দিকে ছুটি পাওয়া কঠিন।
বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নভেম্বর-ডিসেম্বর পরীক্ষা ও ফলাফল তৈরি/প্রকাশের মৌসুম।
যারা পরিবার নিয়ে দূর থেকে আসবেন, তাদের জন্য যাতায়াত ও সময় ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যক্তিগতউপলব্ধিওবিনীতপ্রস্তাবনা
আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, পুনর্মিলনীর নির্ধারিত তারিখটি কিছুটা এগিয়ে আনা হলে অংশগ্রহণ আরও বেশি ও প্রাণবন্ত হতে পারে।
এর অন্যতম কারণ হলো, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে অনেক অভিভাবকের সন্তানদের বার্ষিক, নির্বাচনী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সামনে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়টিও অনেক পরিবারের জন্য অগ্রাধিকার পায়। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই সময় বের করতে সংকোচ বোধ করতে পারেন।
অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্যও বছরের শেষভাগ বেশ ব্যস্ততার সময়। বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুতি ও শিক্ষাবর্ষ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের কারণে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকে। একইভাবে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নভেম্বর-ডিসেম্বর হলো ‘ইয়ার ক্লোজিং’-এর সময়, যখন কর্মব্যস্ততা ও দায়িত্ব অনেক গুণ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় দেওয়াও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমার বিনীত মতামত হলো, তারিখটি পিছিয়ে না দিয়ে বরং কিছুটা এগিয়ে আনার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
অন্যথায়- বিকল্পভাবে, জানুয়ারির শেষের দিকে অথবা পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় আয়োজন করা হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অবশ্যই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, তবে সবার সুবিধা, অংশগ্রহণ এবং অনুষ্ঠানের সার্বিক সফলতার স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানানো যেতে পারে।
অর্থাৎ, সমস্যা শুধু তারিখ নয়, সমস্যার মূল জায়গা হলো অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ সুযোগ নিশ্চিত করা।
মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত: অনুষ্ঠান হবে, নাকি সবার অনুষ্ঠান হবে?
আমার মতে পুনর্মিলনীর সফলতা মঞ্চের আকার, অতিথির সংখ্যা কিংবা ব্যানারের দৈর্ঘ্যে নয়।
সফলতা নির্ভর করে এই প্রশ্নের উত্তরের উপর:
“এই অনুষ্ঠানে কতজন নিজেদের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পেল?”
যদি কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী মনে করেন,
“এটা আমার অনুষ্ঠান নয়, এটা কিছু মানুষের অনুষ্ঠান”
তাহলে আয়োজন যত বড়ই হোক, তার আত্মা অপূর্ণ থেকে যাবে।
কিন্তু যদি একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও মনে করেন,
“এখানে আমারও অংশ আছে”
তাহলে সেই অনুষ্ঠানই প্রকৃত অর্থে সফল।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
আমার মনে হয়েছে, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তারিখ নয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগের ঘাটতি এবং অংশগ্রহণের অনুভূতি আর পুরোটাই আন্তরিকতার অভাব।
যখন মানুষ মনে করে তার মতামত শোনা হচ্ছে না, তখন সে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
যখন মানুষ মনে করে সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত, তখন সে আর আলোচনায় আগ্রহী থাকে না।
আবার কিছু মানুষ মনে করে আমার অংশগ্রহণটা এখানে খাটো করে দেখা হয়েছে কিংবা এখানে-ওখানে সামনে-পিছনে আমার নাম নাই- তো আগ্রহ কমে যায় বা হারিয়ে ফেলে।
যখন মানুষ মনে করে তার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না, তখন তার নিবন্ধন করার আগ্রহও কমে যায়।
এটি কোনো ব্যক্তি বা কমিটির ব্যর্থতা নয়।
বরং এটি একটি বৃহৎ আয়োজনের স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ।
আর সেই কারণেই এখন প্রয়োজন আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি।
একটি সফল পুনর্মিলনীর জন্য কিছু বাস্তবসম্মত প্রস্তাব
১. ব্যাচভিত্তিক প্রতিনিধি ব্যবস্থা
প্রতিটি ব্যাচ থেকে অন্ততঃ ২ জন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করা যেতে পারে।
তাদের দায়িত্ব হবে:
ব্যাচভিত্তিক যোগাযোগ।
তারা নিজ নিজ ব্যাচের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। এতে তথ্য দ্রুত পৌঁছাবে এবং ভুল বোঝাবুঝি কমবে।
নিবন্ধনে সহায়তা প্রদান করা
মতামত সংগ্রহ করা
অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা
কমিটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা
এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হবে।
২. ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও স্বচ্ছতা প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা পরিচালনা করা।
বর্তমান যুগে একটি এমন বড় আয়োজন শুধুমাত্র কাগজের ফরমের উপর নির্ভর করে পরিচালনা করা যথেষ্ট নয়। একটি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অনলাইন রেজিস্ট্রেশন প্ল্যাটফর্ম থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা ল্যাণ্ডিং পেজ থাকলে সেখানে সবাই দেখতে পাবেন:
মোট রেজিস্ট্রেশন সংখ্যা
ব্যাচভিত্তিক অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও বিবরণ
ফাণ্ড সংগ্রহের বিস্তারিত
আয়-ব্যয়ের সারসংক্ষেপ
স্পন্সর তথ্যবিবরণী
অনুষ্ঠান আপডেট
বিভিন্ন ধরনের চার্ট ফ্লো সহ- অনুষ্ঠান সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদির আপডেট
স্বচ্ছতা যত বাড়বে, মানুষের আস্থাও তত বাড়বে- আস্থা থাকবে অবিচল।
আর আস্থা বাড়লে বিতর্ক কমবে।
৩. স্পন্সরশিপ মডেল স্পন্সরশিপ ও স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা
বয়ড়া বাজার এবং আশপাশের এলাকার অসংখ্য ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী আছেন।
স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ব্যবসা এবং বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
তাদের জন্য স্পন্সরশিপ ও বিজ্ঞাপনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
এতে অংশগ্রহণ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক চাপও কমবে।
এর ফলে:
অনুষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমবে
স্থানীয় ব্যবসার প্রচার হবে
কম রেজিস্ট্রেশন ফিতেও মানসম্মত আয়োজন করা সম্ভব হবে
৪. অতিথি নির্বাচনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি মানে সর্বোচ্চা নিরপেক্ষতা বজায় রাখা
রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কৃতি শিক্ষার্থী, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ বা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সবচেয়ে সম্মানজনক অতিথি হওয়া উচিত:
প্রবীণ শিক্ষকবৃন্দ
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকমণ্ডলী
জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখা প্রাক্তন শিক্ষার্থী
এলাকার কৃতি সন্তান
তাহলে অনুষ্ঠানটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
কারণ পুনর্মিলনীর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত বিদ্যালয়, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিতি নয়।
৫. সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্র্যাণ্ডিং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া
ব্যানার, পোস্টার, মঞ্চ এবং প্রচারণায় বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও অর্জনকে তুলে ধরা উচিত।
অনুষ্ঠানের ব্যানার, পোস্টার, মঞ্চ ও প্রচারণায় শুধুমাত্র থাকা উচিত:
বিদ্যালয়ের নাম
বিদ্যালয়ের লোগো
পুনর্মিলনীর থিম
অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য
ব্যক্তি, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বা রাজনৈতিক উপস্থাপনা যত কম হবে, অনুষ্ঠান তত বেশি সবার ও সরব হয়ে উঠবে।
এতে অনুষ্ঠান সবার হয়ে ওঠে।
কিছু কথা সমালোচকদের জন্যও
যেকোন সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মতের ভিন্নতা মানে শত্রুতা নয়।
কঠোর ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য কখনো কোন সমস্যার সমাধান করে না।
গঠনমূলক সমালোচনা একটি আয়োজনকে শক্তিশালী করে।
কিন্তু ধ্বংসাত্মক সমালোচনা মানুষকে নিরুৎসাহিত করে।
আবার কিছু কথা আয়োজকদের প্রতিও
যারা সমালোচনা করছেন, তাদের সবাইকে বিরোধী পক্ষ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
অনেকেই প্রকৃতপক্ষে অনুষ্ঠানটি সফল দেখতে চান বলেই প্রশ্ন তুলছেন।
তাই ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখলে উপকার হবে।
কখনো কখনও একটি সমালোচনার মধ্যেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধানটিও লুকিয়ে থাকে।
আমার চূড়ান্ত উপলব্ধি
এই পুনর্মিলনী কোন কমিটির নয়।
কোনো রাজনৈতিক মতের নয়।
কোন নির্দিষ্ট ব্যাচের নয়।
কোন ব্যক্তি, পরিবারের বা গোষ্ঠিরও নয়।
এটি ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীর সম্মিলিত আবেগের নাম।
আজ থেকে ১০/১৫/২০ বছর পরে মানুষ মনে রাখবে না কে আহ্বায়ক ছিল, কে সদস্য ছিল, কে কোন মতের বা দলের ছিল।
মানুষ মনে রাখবে, পুনর্মিলনীটি কেমন হয়েছিল।
মানুষ মনে রাখবে, পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছিল কি-না।
মানুষ মনে রাখবে, বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে আবারও শৈশবকে ছুঁয়ে দেখা গিয়েছিল কি না।
সুতরাং আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কে জিতলো বা কে হারলো তা নয়, বরং এমন একটি আয়োজন করা, যা আগামী প্রজন্ম উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করবে।
ঈদের সময় আয়োজনের প্রস্তাব: কেন অনেকেই সমর্থন করছেন?
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ঈদের সময়:
অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে থাকেন
অতিরিক্ত ছুটির প্রয়োজন হয় না
পরিবারসহ অংশগ্রহণ সম্ভব হয়
দূরবর্তী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়ে
বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের পরের দিন অনেকের কাছেই বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এটিও একমাত্র সমাধান নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেন বৃহত্তর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
গত এক বছরের আলোচনার দিকে তাকালে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ও শিক্ষা হলো:
একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য শুধু অর্থ সংস্থান, ব্যানার তৈরি, মঞ্চ বা কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন:
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
ভিন্ন মতকে গ্রহণ করার মানসিকতা
স্বচ্ছতা
যোগাযোগ
এবং সবচেয়ে বড় কথা, “আমি” নয়, “আমরা” ভাবনা।
সর্বোপরি-
আমি বিশ্বাস করি, এই পুনর্মিলনী কারো ব্যক্তিগত অর্জনের মঞ্চ নয়।
এটি আমাদের সবার স্মৃতির উৎসব।
এখানে সিনিয়র-জুনিয়র নেই, ধনী-গরিব নেই, দল-মত নেই।
এখানে আমরা সবাই একই পরিচয়ের মানুষ।
আমরা সবাই বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
তাই অনুরোধ থাকবে, আমরা যেন বিতর্ককে দ্বন্দ্বে নয়, সমাধানে রূপান্তর করি। মতপার্থক্যকে বিভাজনের নয়, উন্নয়নের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করি।
আজ যে সিদ্ধান্তই হোক, সেটি যেন সর্বাধিক অংশগ্রহণ, সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে হয়।
কারণ, একটি সফল পুনর্মিলনী শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া একটি সুন্দর উদাহরণ।
আসুন,
আমরা সবাই মিলে ব্যক্তি নয়,
প্রতিষ্ঠানকে বড় করি,
মত নয়, ঐক্যকে বড় করি,
আর পুনর্মিলনীকে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়,
আমাদের সম্মিলিত স্মৃতি,
ভালোবাসা ও গর্বের মহামিলনে পরিণত করি।
মতভেদ থাকুক, কিন্তু মনভেদ নয়।
বিতর্ক থাকুক, কিন্তু বিভক্তি নয়।
সমালোচনা থাকুক, কিন্তু শ্রদ্ধা-সম্মান বজায় রেখে।
আর সর্বোপরি, আমাদের প্রিয় বিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসাই হোক সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
সবার জন্য শুভকামনা রইলো।
সকলের জন্য শুভকামনা ও আন্তরিক শ্রদ্ধা।
ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ সাইফোদ্দৌলা
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
বয়ড়া ইসরাইল আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়
এস. এস. সি. ১৯৯২


Leave A Comment