স্কুল ভর্তিতে ফিরছে পরীক্ষা AdmissionTest 2027, তিন বিষয়ে ১০০ নম্বরে হবে মেধা যাচাই

প্রথম শ্রেণি ছাড়া দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি ও গণিত—এই তিন বিষয়ে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করা হবে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা মেধাতালিকা অনুসারেই মিলবে ভর্তির সুযোগ।

AdmissionTest 2027

প্রায় ছয় বছর পর দেশের বিদ্যালয়গুলোতে ফের পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য নতুন একটি খসড়া নীতিমালা তৈরির কাজ করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খসড়াটি আগামী সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি নীতিমালা প্রকাশ করা হবে।

স্কুল ভর্তিতে বড় বদল, লটারি বাদ দিয়ে এবার পরীক্ষা
School Admission 2027— কোন বিষয়ে কত নম্বর?

তিন বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা

প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মোট ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। পরীক্ষায় তিনটি বিষয় রাখা হচ্ছে—বাংলা, ইংরেজি ও গণিত।

এর মধ্যে বাংলায় থাকবে ৩০ নম্বর, ইংরেজিতে ৩০ নম্বর এবং গণিতে ৪০ নম্বর। অর্থাৎ তিন বিষয়ের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন করা হবে।

পরীক্ষায় অর্জিত নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মেধাক্রম তৈরি করা হবে। এরপর সেই মেধাতালিকা অনুসরণ করেই সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হবে।

এখনো চূড়ান্ত হয়নি নীতিমালা

ভর্তি পরীক্ষার নতুন কাঠামো নিয়ে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তবে এর চূড়ান্ত অনুমোদনের এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। অনুমোদনের পরই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

ফলে বর্তমানে ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টনসহ প্রস্তাবিত কাঠামো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরই এর চূড়ান্ত রূপ জানা যাবে।

সফল হওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

লটারি না পরীক্ষা—বিতর্কে দুই পক্ষ

দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি বাদ দিয়ে পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়েছে।

একটি পক্ষ মনে করছে, লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। অন্যদিকে আরেক পক্ষ ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি পুনরায় চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে।

তবে অভিভাবকদের একটি অংশের দাবি, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বহাল রাখা উচিত। তাদের মতে, অন্তত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সেটি সম্ভব না হলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লটারির সুযোগ রেখে পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ উচ্চতর শ্রেণিতে পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি কার্যক্রম চালু রাখার পক্ষে রয়েছেন তারা।

পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা

তবে অভিভাবকদের এই মতের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন শিক্ষাবিদদের অনেকে। তাদের আশঙ্কা, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঘিরে কোচিং বাণিজ্যও আবার জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের ওপর পরীক্ষার বাড়তি চাপ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা। এর পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

তাদের মতে, সিটি করপোরেশন এলাকার নামি-দামি বিদ্যালয়গুলোতে ধনী পরিবারের সন্তানদের ভিড় আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

‘লটারি বা পরীক্ষা—কোনোটিই মূল সমস্যার সমাধান নয়’

ভর্তি পরীক্ষা কিংবা লটারি—কোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিলেই শিক্ষার্থীদের ভর্তির সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাছাকাছি থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট মানের মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপযুক্ত অনুপাত এবং মানসম্মত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করতে হবে।

তার মতে, এসব মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীদের দূরের নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ছুটতে হবে না। তারা নিজেদের বাড়ির আশপাশের বিদ্যালয়েই পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

‘উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সন্তানদেরও স্থানীয় স্কুলে পড়ানো উচিত’

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান আরও বলেন, মন্ত্রী, আমলা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সন্তানদের তাদের বাসস্থানের কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এমন ব্যবস্থা করা হলে ওই বিদ্যালয়গুলোর মান দ্রুত উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, মূল সমস্যার সমাধান না করে শুধু ভর্তি পরীক্ষা কিংবা লটারি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। এখন সময় এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অবকাঠামোসহ মূল বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার।

যেভাবে চালু হয়েছিল লটারি পদ্ধতি

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়, সেখানে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও একই পদ্ধতি চালু করা হয়।

তবে তখন দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। অর্থাৎ সব শ্রেণিতে একসঙ্গে লটারি ব্যবস্থা চালু হয়নি।

করোনায় বদলে যায় ভর্তি প্রক্রিয়া

পরবর্তীতে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রমে লটারি পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছে।

এবার সেই ব্যবস্থা থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে প্রথম শ্রেণি বাদে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। আর ওই পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে মোট ১০০ নম্বরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি হবে মেধাতালিকা।