সান্ধ্যকালীন কোচিং সেন্টার: শিক্ষার সহায়ক, নাকি স্কুলের বিকল্প হয়ে ওঠার পথে?
“স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু কোচিং মিস করা যাবে না!”
এই একটি বাক্যই হয়তো আমাদের বর্তমান শিক্ষা-বাস্তবতার একটি অস্বস্তিকর ছবি তুলে ধরে।
একজন শিক্ষার্থী সকালে স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, অসুস্থতার অজুহাতে স্কুল ফাঁকি দেয়, টিফিনের সময় বাইরে চলে যায়—কিন্তু বিকেল হলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কোচিংয়ের পথে রওনা হয়। ঝড়-বৃষ্টি, যানজট, ক্লান্তি—কিছুই যেন বাধা নয়।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—
স্কুল কি তবে শিক্ষার্থীর কাছে দায়িত্ব, আর কোচিং কি আনন্দ?
বিদ্যালয়ের শিক্ষক কি শুধু শিক্ষক, আর কোচিংয়ের শিক্ষকই “আপন”?
নাকি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোথাও এমন কিছু পরিবর্তন ঘটেছে, যার ফলে শিক্ষার্থীর কাছে মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে সহায়ক প্রতিষ্ঠান বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে?
এ প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। কারণ সব কোচিং সেন্টার খারাপ নয়, সব স্কুলও সমান নয়, এবং সব শিক্ষার্থীও একই কারণে কোচিংয়ে যায় না। কোথাও অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা প্রয়োজন, কোথাও অভিভাবকের পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রত্যাশা, কোথাও বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সহায়তার ঘাটতি, আবার কোথাও সামাজিক প্রতিযোগিতাই কোচিংকে অপরিহার্য করে তুলেছে।
কিন্তু যখন কোচিং স্কুলের পরিপূরক না হয়ে স্কুলের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্নটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
🏫 “মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি”—কেন এমন মনে হয়?
একটু তীক্ষ্ণভাবে বললে—
“স্কুল থেকে বেশি পছন্দ কোচিং সেন্টার, শিক্ষক থেকে বেশি সম্মান কোচিং শিক্ষক!”
কথাটি ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু এর ভেতরে একটি বাস্তব সামাজিক প্রশ্ন আছে।
একজন শিক্ষার্থী কেন নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থেকেও কোচিংয়ে নিয়মিত যায়?
কেন স্কুলের ৫০ মিনিটের ক্লাসকে “বোঝা যায় না” বলা হয়, অথচ কোচিংয়ের এক ঘণ্টার ক্লাসে একই শিক্ষার্থী মনোযোগী থাকে?
কেন স্কুলের শিক্ষককে দেখলে বিরক্তি, অথচ কোচিং শিক্ষকের জন্য বৃষ্টির মধ্যেও উপস্থিতি?
এর উত্তর শুধু শিক্ষার্থীর চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে।
পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষের কার্যকারিতা, পরীক্ষার চাপ, অভিভাবকের প্রত্যাশা, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং কোচিং-নির্ভর শিক্ষাবাজার—সবকিছু মিলেই এই সংস্কৃতি তৈরি করেছে।
🌆 সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় “দ্বিতীয় স্কুল”
একজন শিক্ষার্থীর দিনের কথা কল্পনা করুন।
সকাল ৭টা—ঘুম থেকে ওঠা।
সকাল ৮টা—স্কুলের প্রস্তুতি।
সকাল থেকে দুপুর—বিদ্যালয়।
বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া।
তারপর বিকেল—
“চলো, কোচিংয়ের সময় হয়ে গেছে।”
এক কোচিং শেষ।
তারপর আরেক ব্যাচ।
কখনো গণিত।
কখনো ইংরেজি।
কখনো বিজ্ঞান।
কখনো আবার “সব বিষয়”।
ফলে শিশুর দিনের বড় একটি অংশ হয়ে যায়—
স্কুল → কোচিং → প্রাইভেট → বাসা → হোমওয়ার্ক → ঘুম।
বিশ্রাম কোথায়?
খেলা কোথায়?
পরিবার কোথায়?
নিজে বই পড়ার সময় কোথায়?
নিজের মতো করে চিন্তা করার সময় কোথায়?
শিক্ষা যদি শুধু একের পর এক ক্লাসে বসার নাম হয়, তাহলে শেখার আনন্দ কোথায়?
📚 কোচিংয়ের প্রয়োজন কেন তৈরি হচ্ছে—এই প্রশ্নটিও জরুরি
শুধু কোচিং সেন্টারকে দায়ী করলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।
বাংলাদেশে private tutoring ও coaching-এর বিস্তার নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংকের একটি পুরোনো বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন গবেষণায় private tutoring-এর ব্যাপক বিস্তার এবং tutoring ও learning outcomes-এর সম্পর্ক নিয়ে মিশ্র ফল পাওয়া গেছে—অর্থাৎ কোচিং করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিতভাবে বাড়ে, এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
সাম্প্রতিক বাস্তবতাতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের একটি Dhaka Tribune অনুসন্ধানে ঢাকার বিভিন্ন নামী স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্কুলের পর coaching/private batch-এ যাওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে; অনেক পরিবারের জন্য এটি স্কুলের খরচের ওপর অতিরিক্ত মাসিক ব্যয়ের কারণও হচ্ছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু—
“শিক্ষার্থীরা কোচিং ভালোবাসে”
—এত সরল নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“কেন এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ তৈরি হলো যেখানে স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত পড়াশোনাকে অনেক পরিবার অপরিহার্য মনে করছে?”
🏫 স্কুলের ক্লাসে ৩০–৪০ জন, কোচিংয়ে ৭০ জন—তবু কোচিং কেন “বোঝায়”?
এখানেই রয়েছে বড় এক বৈপরীত্য।
একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ৩০–৪০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও অনেক সময় শিক্ষককে একই পাঠ্যসূচি, নির্দিষ্ট সময়, পরীক্ষা, খাতা দেখা, প্রশাসনিক দায়িত্ব—সবকিছু সামলাতে হয়।
অন্যদিকে কোচিংয়ের পরিবেশ অনেক সময় পরীক্ষাভিত্তিক, প্রশ্নভিত্তিক ও দ্রুত ফলাফলমুখী।
তখন শিক্ষার্থী ভাবে—
“এখানে তো স্যার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করাচ্ছেন!”
কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মুখস্থ করা?
নাকি—
বুঝতে শেখা, প্রশ্ন করতে শেখা, যুক্তি করতে শেখা এবং নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান করতে শেখা?
🎯 “সকল বিষয়ের বিশেষজ্ঞ” শিক্ষক—এটিও একটি প্রশ্ন
আরেকটি মজার বাস্তবতা দেখা যায়।
একজন শিক্ষক সকালে গণিত পড়াচ্ছেন, বিকেলে বাংলা, সন্ধ্যায় ইংরেজি, রাতে বিজ্ঞান!
তখন রসিকতা করে বলা যায়—
“এতদিন B.Ed., প্রশিক্ষণ আর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজন ছিল কেন? এক ঘণ্টার কোচিং ব্যাচেই যদি সব বিষয়ের পণ্ডিত হওয়া যায়!”
অবশ্য বাস্তবে অনেক শিক্ষক একাধিক বিষয়ে দক্ষ হতে পারেন। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদানের মান, শিক্ষকতার যোগ্যতা এবং pedagogical training—এসব নিয়ে প্রশ্ন করা অত্যন্ত যৌক্তিক।
বাংলাদেশে NTRCA-র মতো প্রতিষ্ঠানও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন ও শিক্ষকতার মান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
অতএব শিক্ষার মানের প্রশ্নে শুধু—
“কোথায় পড়ানো হচ্ছে?”
নয়;
“কে পড়াচ্ছেন, কীভাবে পড়াচ্ছেন এবং শিক্ষার্থী আসলে কী শিখছে?”
—এই তিনটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
🧑🤝🧑 কোচিংয়ের আরেক আকর্ষণ—বন্ধুর দল
একজন কিশোর-কিশোরীর কাছে কোচিং অনেক সময় শুধু পড়াশোনা নয়।
এখানে থাকে—
👬 বন্ধুরা
😄 গল্প
📱 সামাজিক যোগাযোগ
🚶 একসঙ্গে যাতায়াত
☕ বিরতিতে আড্ডা
💬 নিজেদের জগত
ফলে কোচিং হয়ে ওঠে এক ধরনের social space।
তাই কোনো কোনো শিক্ষার্থী হয়তো বিষয় শেখার জন্য যতটা না যায়, তার চেয়ে বেশি যায়—
“সবাই যাচ্ছে বলে।”
একজন গেল।
তারপর আরেকজন।
তারপর পুরো বন্ধুমহল।
শেষ পর্যন্ত অভিভাবকও ভাবেন—
“ওর সব বন্ধুই তো কোচিং করছে, আমার সন্তান না করলে পিছিয়ে যাবে না তো?”
এভাবেই তৈরি হয় social pressure।
💰 কোচিং শুধু শিক্ষা নয়—একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও
বাংলাদেশে coaching/private tutoring-এর ওপর পরিবারের ব্যয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বগুড়াকে নিয়ে প্রথম আলোর একটি সরেজমিন প্রতিবেদনে শহরে বিপুলসংখ্যক coaching centre ও private home-এর বিস্তার, একাধিক বিষয়ে পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দিনের বড় অংশ ব্যয় করা এবং পরিবারের অতিরিক্ত খরচের উদাহরণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে এমন শিক্ষার্থীর কথাও এসেছে যে স্কুলের চেয়ে private/coaching-এ বেশি সময় দিচ্ছে।
আরেকটি প্রতিবেদনে বগুড়ার চার উপজেলার ২৩টি স্কুল নিয়ে গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রায় ৯০% শিক্ষার্থী coaching করত এবং বিভিন্ন ধরনের coaching/private tuition-এ পরিবারের মাসিক ব্যয়ের তথ্যও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ—
কোচিং এখন অনেক পরিবারের শিক্ষা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
প্রশ্ন হলো—
এই বাড়তি অর্থ কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার মান বাড়াচ্ছে, নাকি শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বাড়াচ্ছে?
⏰ সন্ধ্যার কোচিং এবং শিক্ষার্থীর সময়ের সংকট
বিকেলে কোচিং শুরু হলো।
শেষ হলো সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টায়।
তারপর বন্ধুর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা, রাস্তার আড্ডা, যাতায়াত—
বাড়ি ফিরতে ৯টা বা ১০টা।
এরপর খাবার।
তারপর স্কুলের homework।
তারপর আবার পরদিনের প্রস্তুতি।
একজন কিশোরের যদি প্রতিদিন এমন রুটিন হয়, তাহলে তার জন্য—
ঘুম + বিশ্রাম + খেলাধুলা + পরিবার + নিজের পড়া + সৃজনশীলতা
—সবকিছুর ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে যায়।
তাই “আরও পড়ানো” সবসময় “আরও শেখানো” নয়।
এ দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
🚸 স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোচিং—সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত
যদি কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থাকে কিন্তু কোচিংয়ে নিয়মিত উপস্থিত হয়, তাহলে অভিভাবককে শুধু বকা দিলে হবে না।
খুঁজে দেখতে হবে—
কেন স্কুল তার কাছে আকর্ষণীয় নয়?
সম্ভব কারণ হতে পারে—
- ক্লাসে বুঝতে সমস্যা হচ্ছে
- শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক দুর্বল
- সহপাঠীদের পরিবেশ
- পড়ানোর পদ্ধতি আকর্ষণীয় নয়
- পরীক্ষার ভয়
- স্কুলে পর্যাপ্ত academic support না পাওয়া
- অথবা নিছক স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্ক্ষা
কারণটা না বুঝে শুধু “কোচিং বন্ধ করো” বললে সমস্যার মূল জায়গা ধরা নাও পড়তে পারে।
🎭 স্কুলের বিদায় বনাম কোচিংয়ের বিদায়—কেন এত পার্থক্য?
এখানেও একটি অদ্ভুত সামাজিক ছবি দেখা যায়।
স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠানে—
📸 ছবি
😄 হাসি
👋 হাত নাড়া
“স্যার, ভালো থাকবেন।”
কিন্তু কোচিংয়ের বিদায়ে—
🎁 উপহার
📸 স্মৃতি
😭 কান্না
🤝 আলিঙ্গন
💌 আবেগঘন বিদায়
কেন?
কারণ কোচিংয়ে অনেক সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কটি তুলনামূলকভাবে ছোট, অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত হয়।
কিন্তু এর বিপরীত প্রশ্নও করা যায়—
তাহলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এতটা প্রাণবন্ত করা গেল না কেন?
সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীর নয়।
বিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, শিক্ষকতার ধরন এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে মানবিক যোগাযোগ—সবকিছুকেই নতুন করে ভাবতে হবে।
🧠 “কোচিং না করলে পিছিয়ে পড়ব”—এই ভয়টাও কি সমস্যা?
এখানেই আসে Fear of Missing Out—FOMO।
একজন ছাত্র শুনল—
“ওরা সবাই coaching-এ যাচ্ছে।”
তারপর মনে হলো—
“আমি না গেলে পরীক্ষায় পিছিয়ে যাব।”
অভিভাবক শুনলেন—
“অমুকের ছেলে তিনটা coaching করে।”
তিনি ভাবলেন—
“আমার সন্তান তো একটা-ও করে না!”
তারপর শুরু—
আরেকটা ব্যাচ।
এভাবেই শিক্ষা কখনো কখনো হয়ে যায়—
“কে কত বেশি পড়ছে” প্রতিযোগিতা।
কিন্তু আসল প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত—
“কে কত ভালোভাবে শিখছে?”
⚖️ তবে সব কোচিং সেন্টারকে এক চোখে দেখা যাবে না
এ কথাটিও স্পষ্ট করা জরুরি।
কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি দুর্বল বিষয়ে অতিরিক্ত সহায়তা নিতে কোচিংয়ে যায়, সেটি এবং—
স্কুল বাদ দিয়ে সারাদিন coaching-centred routine-এ থাকা
—এক জিনিস নয়।
একজন দায়িত্বশীল coaching teacher শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে সাহায্য করতে পারেন।
কোচিং অনেক ক্ষেত্রে supplementary academic support হিসেবেও কাজ করতে পারে।
কিন্তু যখন—
কোচিং = মূল শিক্ষা
স্কুল = আনুষ্ঠানিকতা
হয়ে যায়, তখন ভারসাম্যের জায়গাটি নষ্ট হয়।
📜 নীতিমালার আলোচনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে private tutoring ও coaching নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। UNICEF-এর একটি South Asia education report-এ বাংলাদেশে private tutoring নিয়ন্ত্রণের নীতিগত কাঠামোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও বিষয়টি আলোচনায় আছে। ২০২৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় coaching centre-কে formal legal framework-এর আওতায় আনার কথা জানিয়েছে এবং স্কুলের ভেতরে academic support শক্তিশালী করে coaching-এর ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
একই সময়ে ২০২৬ সালের শিক্ষা আইন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে coaching-এর সময়, নিবন্ধন এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও শর্তের কথা এসেছে। যেহেতু এটি নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়, তাই বর্তমান কার্যকর আইন/প্রজ্ঞাপন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
অর্থাৎ রাষ্ট্রও সমস্যাটিকে শুধু “শিক্ষার্থী বেশি পড়ছে” হিসেবে দেখছে না; শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকতা, বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভারসাম্য—সবই আলোচনার অংশ।
👨👩👧 অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
সন্তানকে প্রতিদিন তিনটি coaching-এ পাঠিয়ে আমরা কি সত্যিই তাকে বেশি শিক্ষিত করছি?
নাকি শুধু—
তার সময়ের পরিমাণ বাড়াচ্ছি?
একজন শিক্ষার্থী যদি দিনে ১০ ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে কিন্তু নিজের ভাষায় একটি বিষয় ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাহলে সময়ের হিসাব দিয়ে শিক্ষার মান মাপা যাবে না।
অন্যদিকে একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুলে ভালোভাবে শেখে, বাড়িতে নিজে পড়ে, খেলাধুলা করে, বই পড়ে, প্রশ্ন করে এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট বিষয়ে সহায়তা নেয়—তাহলে সেটি অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাজীবন হতে পারে।
🏫 তাহলে সমাধান কী?
সমাধান “সব কোচিং বন্ধ”—এমন সরল কোনো একলাইনের উত্তর নয়।
বরং কয়েকটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
১️⃣ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকে আরও কার্যকর করতে হবে
শিক্ষার্থী যেন মনে না করে—
“আসল পড়া coaching-এ হয়।”
২️⃣ দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য Remedial Support বাড়াতে হবে
যে ছাত্র গণিতে দুর্বল, তাকে পুরো ব্যাচে আরও ২ ঘণ্টা বসিয়ে না রেখে তার নির্দিষ্ট দুর্বলতা শনাক্ত করা দরকার।
৩️⃣ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মানবিক করতে হবে
শিক্ষক যেন শুধু syllabus শেষ করার মানুষ না হয়ে mentor হিসেবেও কাজ করেন।
৪️⃣ অভিভাবকের অতিরিক্ত তুলনা বন্ধ করতে হবে
“অমুকের ছেলে তিনটা coaching করে”—এটি শিক্ষার মানের কোনো নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়।
৫️⃣ শিক্ষার্থীর বিশ্রাম ও খেলাধুলার সময় রাখতে হবে
শিশুর জীবন শুধু পরীক্ষা নয়।
৬️⃣ শিক্ষকতার মান ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে
বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না করে শুধু coaching কমানোর চেষ্টা করলে সমস্যার মূল কারণ থেকে যাওয়া সম্ভব।
🌱 আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—“কোচিংবিরোধী” নয়, “কোচিং-নির্ভরতা কমানো”
কারণ একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাহায্য নিতেই পারে।
কিন্তু এমন শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার যেখানে—
স্কুলেই শেখার ভিত্তি তৈরি হবে।
কোচিং থাকলে সেটি হবে—
সহায়ক, বিকল্প নয়।
✍️ শেষ কথা
সন্ধ্যা ৭টা।
একজন ছাত্র কোচিং থেকে বের হলো।
তার হাতে বই।
কাঁধে ব্যাগ।
সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু।
রাস্তার পাশে আরেকটি স্কুল।
স্কুলের গেট বন্ধ।
হয়তো ভেতরে একজন শিক্ষক আগামী দিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আর বাইরে একজন অভিভাবক অপেক্ষা করছেন—
“কোচিং শেষ হয়েছে, এবার বাসায় চল।”
এই দৃশ্য আমাদের কাছে এখন খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু একদিন থেমে প্রশ্ন করা দরকার—
শিক্ষার্থীর দিন কি শেখার জন্য দীর্ঘ হচ্ছে, নাকি শুধু ক্লাসের সংখ্যা বাড়ছে?
আমরা কি সন্তানকে জ্ঞানী করছি, নাকি পরীক্ষামুখী করছি?
স্কুল কেন তার কাছে দায়িত্ব আর কোচিং কেন আনন্দ?
একজন শিক্ষার্থী কেন স্কুলে অনুপস্থিত থাকলেও কোচিংয়ে শতভাগ উপস্থিত?
শিক্ষককে কেন শ্রদ্ধা করার জায়গাটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
আমরা কি এমন একটি বিদ্যালয় তৈরি করতে পারি, যেখানে শিক্ষার্থীকে পড়তে বলা লাগবে না—সে নিজেই পড়তে চাইবে?
সেদিন হয়তো কোচিং থাকবে, private tuition-ও থাকবে—কিন্তু স্কুলকে পাশ কাটিয়ে নয়; স্কুলের শেখাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য।
কারণ শিক্ষা শুধু “কত ঘণ্টা পড়লে” হয় না।
শিক্ষা হয় যখন—
শিক্ষার্থী বুঝতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, ভুল করতে ভয় পায় না, শিক্ষককে বিশ্বাস করে এবং শেখাকে ভালোবাসতে শুরু করে।
আর সেই জায়গাটি তৈরি করার দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়—
বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক এবং পুরো সমাজের।
Leave A Comment