“শ্রদ্ধেয় অভিভাবক / অভিভাবিকা”,

শুভেচ্ছা রইলো,
শিশুরা ছবি আঁকছে, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে, প্রথম-দ্বিতীয় হচ্ছে, সনদপত্র বিতরণ চলছে, এমনকি সাধারণ স্কুল গুলোতেও ছবি আঁকার জন্য নম্বর দে’য়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছে এবং জাপান-ভারত থেকেও পুরস্কার জিতে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শিশুগুলো বড় হয়ে যায় কোথায় ? কোন ধূম্র ধূসরে মিলিয়ে যায় তারা ?
কিল-গুতো দিয়ে এসব বাচ্চাদেরকে নম্বর কিংবা পুরস্কার পাবার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। ছবি এরা আঁকেনা, ছবি এদের থেকে জোর করে আঁকিয়ে নে’য়া হয়। এদেরকে কেউ ঘোড়ার ডিম আঁকতে বলেনা, বলে- হাঁস মুরগীর ডিম আঁকতে। অথচ ঘোড়ার ডিম আঁকাটাই বাচ্চাদের জন্য খুবই জরুরি, এই জরুরি বিষয়টি থেকে শিশুদেরকে বিরত রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোন শিশুচিন্তা এদের মনে কাজ করেনা, করতে দে’য়া হয়না। যেখানে কোন স্বাধীন চিন্তা নেই- শিশুচিন্তা নেই সেখানে শিল্পীচিন্তা অনুপস্থিত। অতএব ‘‘হিসাব সোজা”- এরা শিল্পী হবেনা।
এমন গলদের কথা জানা সত্ত্বেও আমরা আমাদের বিদ্যাপীঠগুলোতে শুরু করেছি আমাদের স্বপ্নযাত্রা। পূর্ব অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি বিশাল একটি ঘাপলার মধ্যে আছি আমরা। আমাদের অভিভাবকগণও অনেকেই উপরোক্ত অভিযোগগুলো থেকে মুক্ত নন। একটি শিশু যদি একটি মানুষ আঁকে, তার দুটি শিং-ও কখনো কখনো এঁকে ফেলে, এতে আমাদের বিদ্যাপীঠগুলোর শিক্ষকগণ সেই শিশুটিকে সাবাসী প্রদান করেন কখনো কখনোও। অন্যদিকে অভিভাবকগণ নাক সিটকান, তাদের দাবী হচ্ছে- মানুষের আবার শিং থাকে নাকি ! আকাশ আবার হলুদ রঙের হয় নাকি ! এতে করে কি স্কুলে কিংবা প্রতিযোগিতায় নম্বর উঠবে ? আর আমাদের শিক্ষকদের ফ্যাসাদটাও সেখানেই। শিক্ষকরা চাচ্ছেন স্কুলের নম্বরী দাওয়াই থেকে প্রকৃত শিশুসুলভ চিন্তাটাকে বের করে আনতে, কিন্তু তারা তা পারছেন না।
শিল্পী সমাজেরও কখনো কখনো সমস্যা ধরা পড়ে। তাঁরা যখন প্রতিযোগিতায় বিচারক থকেন, তখন তাঁরা ভুলেই যান শিশু সুলভ চেতনাটিকে এবং তাঁরা প্রতিযোগিতার বিচারের জায়গাটিতে বয়স্কতার দৃষ্টি ছাপ অনেক ক্ষেত্রে রেখে দেন। যেহেতু তাঁরা শিল্পী, সেহেতু সেই অধিকার তাঁদের সার্টিফিকেটে সংরক্ষিত থাকে। কাজেই তাঁদেরকে নিয়ে বেশি কথা বলার মতো মাস্টার আমরা নই। যেহেতু আমরা শিশুদের নিয়ে কাজ করি, সেহেতু এইসব বয়স্ক দৃষ্টিভঙ্গি যে শিশুদের জন্য কত বড় ক্ষতির কারণ, তার প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে ঢের- বেশ সম্ভাবনাময় শিশুটিকে ক’দিন পরই আর খুঁজে পাই না।
একুশ শতকে এসে সৃজনশীলতাকে স্কুলিং- এর বাইরে রাখা যাবে না। তাই বলে স্কুলিং- এর বাইরে সৃজনশীলতা নেই এমনটিও বলা যাবেনা। কথা হচ্ছে, এমন স্কুলিং ব্যবস্থা করা যাতে সৃজনশীলতা বিঘ্নিত না হয়ে বরং উৎসাহ পায়। এই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই আমরা আমাদের স্কুলগুলোতে প্রবর্তন করতে চাই- “বর্ষ সেরা পদক” যা শিশুর শৈল্পিক সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে বিবেচনা করা হবে। তাছাড়াও প্রতিটি ক্লাসে শুধুমাত্র সৃজনশীলতার জন্যে তাৎক্ষণিক ভাবে শ্রেণী সেরা পুরস্কার প্রদান করা হবে।
ড্রইং বিষয়ে আমাদের স্কুলে বর্তমানে তিনটি বিভাগ। ঊষা, প্রভাত, সকাল। সারা বছর শিক্ষকগণ শিশুটির আঁকার ধরণ লক্ষ্য করে বছর শেষে বিবেচনা করবেন কোন শিশুটি “বর্ষ সেরা পদক” পেতে পারেন।
এছাড়াও প্রতিটি শিশুকে তার শ্রেণী উত্তীর্ণ হলে বর্ষ শেষে একটি সার্টিফিকেট দে’য়া হবে। এবছর আমরা শিশুদের দু’টি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি- “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ” এবং “বিশ্ব শিশু অধিকার” দিবস উপলক্ষে।
আগামীতে আরও অধিক গুরুত্ব সহকারে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা সহ তা প্রদর্শনীর আয়োজন করার আশা রাখি। দেখা যাক, এসব উৎসাহে বেরিয়ে আসে কি-না আগামী দিনের জনতার শিল্পী, প্রকৃত মানবতার শিল্পী।
প্রিয় সুহৃদ অভিভাবক,
“আজকের শিশু আগামী দিনের বিশ্ব জয়ের হাতিয়ার”। আজকের শিশুটিই আগামীর জয়নুল, কামরুল, সুলতান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। শিশুরা আমাদের অত্যন্ত আদরের। প্রত্যেক বাবা-মা’ই চান শিশুর ইচ্ছা পূরণ করতে।
প্রত্যেকটি শিশুর মধ্যেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কোন না কোন সুপ্ত প্রতিভা। আর এই সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দে’য়ার দায়িত্ব অভিভাবকগণেরই। অনেক সময় আমরা অভিভাবকগণ শিশুদের চাহিদা পূরণ করতে, তাদেরকে খুশি দেখার জন্য অজ্ঞতা, অসাবধানতাবসতঃ তাদের হাতে তুলে দেই বিভিন্ন বিনোদনমূলক, ক্ষতিকারক দামী খেলনা সামগ্রী। যা সহজেই এইসব শিশুদের প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়ে সহায়ক।
পৃথিবীর আদিমতম ভাষার মধে চিত্রকলা একটি। যা প্রতিটি শিশুর চোখেই জ্বলজ্বল করে। প্রত্যেকটি শিশু মনের অজান্তেই স্বপ্ন দেখে, ছবি আঁকে। প্রতিটি শিশুই এক এক জন শিল্পী। শিশুর মানসিক বিকাশে, মনের লুকায়িত ভাষা প্রকাশে চিত্রকলার ভূমিকা অপরিসীম। আর তাই বর্তমান বিশ্বে চারুকলা/ড্রয়িং বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি বিধায় আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকেও তা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
শিশুদের মেধা, চিন্তাধারা, আর সৃজনশীলতার সুস্থ ও পরিপূর্ণ বিকাশের দিকটি খেয়াল রেখে, মনস্তাত্বিকভাবে শিশুর বেড়ে ওঠার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দে’য়াটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
এ ব্যপারে অভিভাবক হিসেবে আপনার মূল্যবান মতামত, পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের কাজ আরো সুন্দর ও সহজভাবে সম্পন্ন করতে পারবো বলে আমরা বিশ্বাস করি।
ধন্যবাদ
মোহাম্মদ সাইফোদ্দৌলা
০১৭১১ ৩৫৩ ৩৬৩
২৫ আগস্ট, ২০০০ খ্রি:
Leave A Comment